কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলায় জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে আবু কাউছার নামের এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার নন্দিরবাজার এলাকায় এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে। আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় গোমতী নদীর উত্তর পাড়ে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আবু কাউছারকে (৪৫) কুপিয়ে জখম করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত আবু কাউছার কুমিল্লা নগরের কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক মাসুম নামের আরও একজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
নিহত আবু কাউছারের বন্ধু শামীম হোসেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তৌহিদুল ইসলাম ওরফে তৌহিদের নেতৃত্বে একদল লোক কাউছারের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তৌহিদুল আদর্শ সদর উপজেলার নন্দিরবাজার এলাকার খোরশেদ আলমের ছেলে।
জানা গেছে, নিহত কাউছারের বন্ধু শামীম হোসেনের সঙ্গে নন্দিরবাজার এলাকার তৌহিদুল ও তানজিলের ছত্রখিল এলাকার একটি জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছিল। শামীমের দাবি, তিনি ওই জমিটি কিনেছিলেন, কিন্তু তাঁদের জমি দখলে বাধা দেওয়া হচ্ছিল। এই বিরোধের জেরে শুক্রবার তিনি কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে জমিটি দেখতে যান। সেই মুহূর্তেই তৌহিদুলের নেতৃত্বে হামলাকারীরা তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং কাউছারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরবর্তীতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
কুমিল্লা মহানগর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান (বিপ্লব) জানান, আবু কাউছার আগে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সদস্য ছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কাউছার নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যদিও তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি ছিল না। উল্লেখ্য, কাউছারের বড় ভাই কবির হোসেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন, এই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া তৌহিদুল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি ওই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন বলে দাবি করেন খলিলুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৌহিদুলের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয় এবং ওই মামলায় ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি ছয় মাস কারাগারে ছিলেন।”
তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে তৌহিদুল বা তাঁর পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকেই তাঁরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। বাড়িতে কয়েকজন নারী থাকলেও তাঁরা এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবু কাউছারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার বিকেলে অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে শতাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষ নন্দিরবাজার এলাকায় জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা তৌহিদুলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন এবং বাড়ির কয়েকটি কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ঘরের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাড়ির জানালার কাচসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ভেঙে ফেলা হয়। একই সময়ে বাড়ির সামনে অবস্থিত একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ভাঙচুর চালানো হয়।
খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পুলিশের উপস্থিতিতেই বাড়ির লোকজন আগুন নেভাতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে কুমিল্লা থেকে পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য সেখানে মোতায়েন করা হয়।
শুক্রবার রাত ৯টার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিকেলে একদল বিক্ষুব্ধ লোক নন্দিরবাজার এলাকার তৌহিদুলের বাড়িতে ভাঙচুর চালান এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করেন। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”
হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে ওসি আরও জানান, ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তৌহিদুলসহ কয়েকজন এই ঘটনায় জড়িত। তাঁদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।