কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় যুবদল কর্মী আবু কাউছারকে (৪৫) হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। পুলিশের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মালিকানাধীন একটি জমিতে কফির দোকান নির্মাণকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘাতকরা আগে থেকেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং কাউছার ও তাঁর সঙ্গীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ ও এসআরবি-১১ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান তাঁর কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। পরবর্তীতে এসআরবি-১১-এর উপপরিচালক ও কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম অভিযুক্ত তানজিরকে গ্রেপ্তারসহ অভিযানের খুঁটিনাটি জানান।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত তৌহিদুল ইসলাম ওরফে তৌহিদকে শুক্রবার মধ্যরাতে কুমিল্লা নগরের নুরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। প্রায় একই সময়ে তাঁর বড় ভাই তানজিরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মাছিহাতা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-১১।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, “সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় উপজেলা মডেল মসজিদের বিপরীতে পাউবোর মালিকানাধীন একটি জায়গা নিয়ে কাউছার ও তাঁর বন্ধু শামীমের সঙ্গে তৌহিদ ও তাঁর বড় ভাই তানজিরের বিরোধ ছিল। ঘটনার দিন শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তৌহিদ, তানজিরসহ কয়েকজন ওই জায়গায় কফির দোকান নির্মাণের কাজ করছিলেন।”
পুলিশ সুপারের ভাষ্যমতে, দোকান নির্মাণের কাজ শুরু করলে কাউছার ও শামীম বাধা দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা ছিল তৌহিদ ও তাঁর সহযোগীদের। এই আশঙ্কায় তৌহিদ তাঁর বড় ভাই তানজিরকে ফোন করে আরও কয়েকজনকে দেশীয় অস্ত্রসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হতে বলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কাউছার ও তাঁর সঙ্গীরা সেখানে পৌঁছালে তাঁদের ওপর হামলার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউছার ও তাঁর বন্ধু শামীমসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তৌহিদ, তানজির ও তাঁদের সঙ্গে থাকা অন্যরা অতর্কিত হামলা চালান। এই সময় তৌহিদ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাউছারকে গুরুতর জখম করেন এবং অন্যরাও তাঁকে মারধর করেন। এই হামলায় অটোরিকশাচালক মাসুমও আহত হন। গুরুতর আহত কাউছারকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে ওই জায়গাটি নিয়ে বিরোধের মূল কারণ, জমিটি কাউকে ইজারা দেওয়া হয়েছিল কি না এবং সেখানে দোকান নির্মাণের বৈধতা ছিল কি না—এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পুলিশ সুপার জানান, জায়গাটি পাউবোর মালিকানাধীন বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই আসামিদের গ্রেপ্তারে ব্যাপক অভিযান শুরু করে পুলিশ। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নগরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নুরপুর এলাকা থেকে তৌহিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কাছাকাছি সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মাছিহাতা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাঁর বড় ভাই তানজিরকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-১১।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্তসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ও এসআরবি যৌথভাবে কাজ করায় দ্রুত আসামিদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
মেজর সাদমান ইবনে আলম সংবাদ সম্মেলনে জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা কাজ করছেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে, তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তাঁদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আরও জানান, তৌহিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলা রয়েছে এবং এসব মামলায় তিনি জামিনে ছিলেন। তানজিরের বিরুদ্ধে একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আসামিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, তাঁরা কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিবেচনা করছেন না; অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনাই তাঁদের লক্ষ্য। নিহত কাউছার যুবদলের নেতা ছিলেন বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁদের অপরাধের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনায় কাউছারের ভাই কবির হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় তৌহিদ ও তানজিরের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা অন্যদের আসামি করে আজ একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে নুরপুর এলাকায় তৌহিদকে আটকের পর বিক্ষুব্ধ লোকজন তাঁকে কয়েক দফা মারধর করেন। পরে পুলিশ তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। মারধরের ফলে তাঁর পা থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।
হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার বিকেলে আদর্শ সদর উপজেলার ছত্রখিল এলাকায় তৌহিদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসময় বাড়ির কয়েকটি কক্ষে আগুন দেওয়া হয় এবং বাড়ির সামনে থাকা একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরবর্তীতে পুলিশ সেখানে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।