নতুন দেশ, নতুন মানুষ আর এক নতুন জীবন। দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ ও আপনজনদের ছেড়ে যখন কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান, তখন প্রতিদিনের অতি সাধারণ অভ্যাসগুলোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ক্লাসে নিজের মতামত সাহসের সঙ্গে তুলে ধরা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা, নিজের খাবার নিজেই তৈরি করা কিংবা মন খারাপের দিনে পরিবারকে পাশে না পাওয়া—সব মিলিয়ে ভিনদেশে শুরুর দিনগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলোই একজন শিক্ষার্থীকে ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হতে শেখায়, ভিন্নতাকে বুঝতে সাহায্য করে এবং নিজের মতো করে নতুন পরিবেশে জায়গা তৈরি করে নিতে অনুপ্রাণিত করে।

বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভাষা জানা কেবল ক্লাসের পাঠ বোঝার জন্য নয়, বরং স্থানীয়দের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও গন্তব্য দেশের স্থানীয় ভাষার কিছু শব্দ ও বাক্য জানা দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে। তাই যাত্রার আগেই সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা শেখার কোর্স, রাইটিং সেন্টার বা শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলোও যথাযথভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

দেশভেদে মানুষের আচরণ, সামাজিক রীতিনীতি, সময়ের গুরুত্ব, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং যোগাযোগের ধরনে ব্যাপক পার্থক্য থাকে। নতুন দেশে গিয়ে এই পার্থক্যগুলোকে ভুল বা অস্বাভাবিক হিসেবে না দেখে বরং বোঝার চেষ্টা করা উচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং স্থানীয় নিয়মকানুনকে সম্মান জানানো নতুন পরিবেশে দ্রুত মিশে যেতে সাহায্য করে।

খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা শুরুতে বেশ সমস্যায় পড়তে পারেন। পরিচিত স্বাদের খাবার না পাওয়া, রান্নার অভিজ্ঞতা না থাকা কিংবা খাবারের উচ্চমূলের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তাই যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দেশের খাবার, বাজারের ধরন ও রান্নার সুযোগ সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে কয়েকটি সহজ ও পুষ্টিকর খাবার রান্না করা শিখে যাওয়া ভালো। নিজের পছন্দ ও খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন ধরনের খাবার চেখে দেখার মানসিকতা রাখা উচিত।

পরিবার ও প্রিয় বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে একাকিত্ব বা মন খারাপ হওয়া খুব স্বাভাবিক। বিশেষ করে প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা মাসগুলোতে পরিচিত পরিবেশের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে। এই সময়ে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি। তবে কেবল দেশের মানুষের মধ্যেই যোগাযোগ সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত, যা দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও প্রসারিত করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিলে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে নিজের শখ বা আগ্রহের কাজগুলো চালিয়ে যাওয়া উচিত। যদি দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ থাকে, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা একাকিত্ব দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় প্রভাব ফেলে, তবে দেরি না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সেবা বা শিক্ষার্থী-সহায়তাকেন্দ্রের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

বিদেশে নতুন পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার বিষয়ে সেবা কনসালটেন্সি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিদেশে গিয়ে শিক্ষার্থীরা সাধারণত ভাষা, খাবার ও সংস্কৃতির পার্থক্যের মুখোমুখি হন। মানিয়ে নিতে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা, খাবার ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি।’

মোহাম্মদ রাসেল মিয়া আরও বলেন, ‘একাকিত্ব কাটাতে বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি সবার সঙ্গে ভালো আচরণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা প্রয়োজন।’

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাসে আলোচনা, দলগত কাজ, গবেষণা, প্রেজেন্টেশন এবং স্বাধীনভাবে শেখার প্রক্রিয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই কেবল পরীক্ষার আগে পড়ার অভ্যাস ছেড়ে নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা লিখে রাখা, ক্লাসের নোট গুছিয়ে রাখা এবং কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে শিক্ষক বা সহপাঠীর সাহায্য নেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সহায়তা কেন্দ্রগুলোও এক্ষেত্রে দারুণ কার্যকর হতে পারে।

নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজেকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুরুতেই সবকিছু বুঝে ফেলা বা সবার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করা সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের পরিস্থিতির তুলনা না করে ছোট ছোট অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রেখেও নতুন পরিবেশ থেকে অনেক কিছু শেখা সম্ভব। ধৈর্য, কৌতূহল এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়ার মানসিকতাই বিদেশে একটি সুন্দর ও সফল জীবন গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি হতে পারে।