বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যাশামতো না হলেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বর্জন করার প্রয়োজন নেই। পছন্দের বিষয়ে আরও জ্ঞান অর্জন এবং বিদেশের মাটিতে নতুন অভিজ্ঞতা লাভের আকাঙ্ক্ষা অনেকেরই থাকে, কিন্তু সিজিপিএ কম হওয়ায় আবেদনের আগেই অনেকে দমে যান। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেবল একটি একাডেমিক ফলাফলই একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা নির্ধারণ করে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির শর্তাবলি ভিন্ন হয়ে থাকে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান একাডেমিক রেজাল্টের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং অন্যান্য অর্জনকেও গুরুত্ব দেয়। তাই নিজের যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ খুঁজে বের করে পরিকল্পিতভাবে আবেদন করাই এখনকার প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
প্রথমে শিক্ষার্থীদের উচিত তাদের একাডেমিক রেজাল্টের সাথে মানানসই দেশ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কোর্স নির্বাচন করা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সিজিপিএ-র শর্তে ছাড় দেওয়া হয় অথবা বিকল্প যোগ্যতার সুযোগ রাখা হয়। তবে ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করেই ভর্তি নিশ্চিত হবে—এমন ধারণা করা সঠিক নয়।
একাডেমিক রেজাল্টের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রাসঙ্গিক কাজের অভিজ্ঞতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণাপত্র, মানসম্মত পোর্টফোলিও কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি একটি শক্তিশালী স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি), যথাযথ সুপারিশপত্র এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আবেদনটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আইইএলটিএস বা টোয়েফলের মতো ইংরেজি ভাষাদক্ষতার পরীক্ষা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক। তবে সব প্রতিষ্ঠানে এই নিয়ম এক নয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববর্তী শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি হলে তার প্রমাণপত্র, বিকল্প ভাষা পরীক্ষা কিংবা নিজস্ব মূল্যায়নের মাধ্যমে ইংরেজি দক্ষতা যাচাই করে থাকে। তবে এই শর্তগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রোগ্রাম ভেদে ভিন্ন হয়।
কম সিজিপিএ নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আবেদনের প্রক্রিয়া, বিকল্প ভর্তির সুযোগ এবং আইইএলটিএস ছাড়াই ভর্তির শর্তাবলি সম্পর্কে স্টাডি অ্যাব্রোড কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান এএইচজেডের কান্ট্রি ম্যানেজার (বাংলাদেশ) ওয়াহিদ জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কম সিজিপিএ থাকলেই বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স বাছাই করতে হবে।’
ওয়াহিদ জামান আরও বলেন, ‘পাথওয়ে বা প্রি–মাস্টার্স প্রোগ্রামের শর্ত, টিউশন ফি এবং পরবর্তী ডিগ্রিতে ভর্তির যোগ্যতা যাচাই জরুরি। আইইএলটিএসের বিকল্প হিসেবে এমওআই সনদ বা অন্য পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য কি না, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি ভর্তি ও ভিসার শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করা উচিত।’
পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি ভর্তির শর্ত পূরণ করা সম্ভব না হলে বিকল্প পথগুলো খতিয়ে দেখা যেতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠানে ফাউন্ডেশন, প্রি-মাস্টার্স বা পাথওয়ে প্রোগ্রামের মাধ্যমে মূল কোর্সে প্রবেশের সুযোগ থাকে। আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে শর্তসাপেক্ষ ভর্তি কিংবা অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক কোর্সের ব্যবস্থাও থাকে। তবে এই সুযোগগুলো সব দেশ বা সব শিক্ষা স্তরে পাওয়া যায় না। তাই আবেদনের আগে প্রোগ্রামের যোগ্যতা, অতিরিক্ত ব্যয়, সময়সীমা এবং পরবর্তী ডিগ্রিতে যাওয়ার শর্তগুলো যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
শুধুমাত্র আইইএলটিএস ছাড়াই ভর্তি কিংবা কম সিজিপিএ-তে সুযোগ পাওয়ার বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, কোর্সের মান, টিউশন ফি, বৃত্তির শর্ত এবং ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাগত যোগ্যতা গুরুত্বের সাথে যাচাই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে বিকল্প ভাষাগত যোগ্যতা গ্রহণ করলেও ভিসা বা বৃত্তির আবেদনের ক্ষেত্রে আলাদা ও কঠোর শর্ত থাকতে পারে।
পরিশেষে, যাঁদের সিজিপিএ কম, তাঁদের উচিত নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা এবং যথেষ্ট সময় নিয়ে আবেদন প্রস্তুত করা। এটাই হতে পারে তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণের প্রথম ও সঠিক ধাপ।