প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি কমাতে বিশ্বজুড়ে এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘জিরো ট্রাস্ট’ নিরাপত্তাকাঠামো। এই আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল কথা হলো—নেটওয়ার্কের ভেতরে কিংবা বাইরে অবস্থান করা কোনো ব্যক্তি বা যন্ত্রকেই আগে থেকে বিশ্বস্ত বলে গণ্য করা হবে না। ফলে যেকোনো তথ্য, সেবা কিংবা ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবার ব্যবহারকারীর পরিচয় এবং অনুমোদনের বৈধতা অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করা হয়।
বিষয়টিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, প্রচলিত তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তাব্যবস্থায় সাধারণত নেটওয়ার্কের ভেতরে থাকা ব্যক্তি ও যন্ত্রগুলোকে বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু জিরো ট্রাস্ট ব্যবস্থায় কাউকেই আগাম বিশ্বাস করা হয় না। নেটওয়ার্কের ভেতরে বা বাইরে যেখান থেকেই কেউ প্রবেশের চেষ্টা করুক না কেন, তাকে বাধ্যতামূলকভাবে যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
প্রচলিত নেটওয়ার্ক নিরাপত্তায় মূলত বাইরের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়, যাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় ‘ক্যাসল অ্যান্ড মোট’ মডেল বলা হয়। তবে এই মডেলের একটি বড় দুর্বলতা হলো, কোনো হ্যাকার একবার নেটওয়ার্কের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হলে তাকে সাধারণত বিশ্বাস করা হয়। এর ফলে সাইবার হামলাকারী নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়লে ভেতরে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ব্যবস্থার ওপর অবাধ প্রবেশাধিকার পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া বর্তমান সময়ে তথ্যের বড় অংশ ক্লাউডে সংরক্ষিত থাকায় কেবল বাইরের প্রবেশপথ সুরক্ষিত রাখাই যথেষ্ট নয়। আইবিএম-এর দেওয়া তথ্যমতে, একটি তথ্যফাঁসের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের গড় ক্ষতি ৩০ লাখ ডলারের বেশি হতে পারে। এই বিশাল আর্থিক ও তথ্যের ঝুঁকি কমিয়ে আনতেই জিরো ট্রাস্ট মডেলের আবির্ভাব ঘটেছে।
২০১০ সালে গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফরেস্টার রিসার্চ প্রথম ‘জিরো ট্রাস্ট’ ধারণাটি সামনে আনে। পরবর্তীতে গুগল তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে এই ব্যবস্থা চালু করলে এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। জিরো ট্রাস্ট বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘জিরো ট্রাস্ট নেটওয়ার্ক অ্যাকসেস’ (জেডটিএনএ)। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এটি অননুমোদিত ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে পুরো নেটওয়ার্ককে অদৃশ্য করে রাখে এবং ব্যবহারকারী ও কাঙ্ক্ষিত সেবার মধ্যে একটি এনক্রিপ্ট করা পৃথক সংযোগ তৈরি করে। এর ফলে একজন ব্যবহারকারী কেবল তার কাজের জন্য নির্ধারিত নির্দিষ্ট তথ্যে প্রবেশের সুযোগ পান, পুরো নেটওয়ার্কে নয়। এতে করে পরিচয় চুরি হওয়া বা কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্র হ্যাক হলেও পুরো নেটওয়ার্ক ঝুঁকির মুখে পড়ে না।