সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার জন্য আমরা অনেকেই অ্যালার্ম ঘড়ির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। কারও অভ্যাস একটি মাত্র অ্যালার্ম সেট করা, আবার কেউ কেউ পাঁচ মিনিট পরপর একাধিক অ্যালার্ম দিয়ে রাখেন। অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম অ্যালার্মে ঘুম ভাঙলেও তৎক্ষণাৎ বিছানা ছাড়ার ইচ্ছা জাগে না, ফলে স্নুজ বাটন চেপে আরও কিছুক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করেন তারা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘুম ভাঙার এই প্রচলিত অভ্যাসগুলো কি আমাদের শরীরের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে?

মার্কিন স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় ঝিমুনি, মনোযোগের ঘাটতি ও ধীরগতিতে চিন্তা করার অনুভূতি সাভাবিকভাবেই হতে পারে। একে বলা হয় স্লিপ ইনর্শিয়া (Sleep Inertia)। হঠাৎ ঘুম ভাঙা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা ঘুমের অনিয়মিত সময়সূচি স্লিপ ইনর্শিয়ার এই সমস্যাকে আরও বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, মিডিয়াম প্ল্যাটফর্মের ইলুমিনেশন প্রকাশনায় লেখক অ্যান্টনি টেরেন্সের একটি নিবন্ধে জোরে অ্যালার্মের শব্দ, বারবার অ্যালার্ম দেওয়া এবং ঘুমের অভ্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে অ্যালার্ম ঘড়ি সরাসরি প্রাণঘাতী বা দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্‌রোগের কারণ, এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া মতো কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

জোরে অ্যালার্মে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে কী হতে পারে?

ঘুমের গভীরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তীব্র শব্দ শুনে জেগে উঠলে যে কেউ চমকে যেতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে হৃদ্‌স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অস্বস্তি বা বিরক্তি অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যাদের ঘুমের ঘাটতি রয়েছে, তাদের সকালে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে।

তবে শুধু অ্যালার্মের শব্দের কারণে দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো কোনো প্রমাণ নেই। বরং নিয়মিত কম ঘুমানো, ঘুমের খারাপ মান এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মিত জীবনযাপন স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্ভব হলে কানে অস্বস্তি তৈরি করে এমন তীব্র শব্দের পরিবর্তে ধীরে ধীরে শব্দের জোর বাড়ে, এমন অ্যালার্ম বা তুলনামূলক কোমল সুরের অ্যালার্ম ব্যবহার করতে পারেন।

বারবার স্নুজ বাটন চাপবেন না

অ্যালার্ম বাজার পর আরও পাঁচ বা দশ মিনিট ঘুমানোর জন্য স্নুজ বাটন চাপার অভ্যাস অনেকেরই আছে। কিন্তু এভাবে বারবার ঘুম ভাঙা ও আবার ঘুমিয়ে পড়ার ফলে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, “বারবার স্নুজ করার অভ্যাস ঘুম থেকে ওঠার পর ঝিমুনি কাটতে দেরি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।” যদিও এ বিষয়ে গবেষণা এখনও সীমিত, তবুও যেটুকু গবেষণা হয়েছে তা অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ঘুম ভাঙার পর আবার ঘুমিয়ে পড়া সকালে সতেজ বোধ করার জন্য আদর্শ না।

তাই ঘুমানোর সময় এমনভাবে ঠিক করুন, যাতে সকালে অ্যালার্ম বাজার পর পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে বলে মনে হয়। প্রয়োজন হলে অ্যালার্ম বিছানা থেকে কিছুটা দূরে রাখুন, যাতে বন্ধ করতে হলে আপনাকে উঠে দাঁড়াতে হয়।

প্রতিদিন ঘুমানোর ও ওঠার সময় নির্দিষ্ট রাখুন

কোনো দিন রাত ১০টায় ঘুমানো, আবার কোনো দিন রাত ২টায় বিছানায় যাওয়া—এমন অনিয়মিত অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও ঘুম থেকে ওঠার চক্রে ব্যাঘাত ঘটায়। আমাদের শরীরে একটি অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি আছে, যা আমাদের কখন ঘুম পাবে এবং কখন জেগে থাকতে ভালো লাগবে, তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ঘুমানোর ও ওঠার সময় এই চক্রকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ঘুমানোর ও ওঠার সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করার চেষ্টা করুন; এই পার্থক্যের পরিমাণ এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে রাখা শ্রেয়। এতে সকালে ঘুম থেকে ওঠা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

সকালে অ্যালার্ম বাজার পরও যদি শরীর ক্লান্ত লাগে, তবে শুধু অ্যালার্মের শব্দকে দায়ী করবেন না। এর একটি সাধারণ কারণ হতে পারে আপনার পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া। বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রাতে অন্তত সাত ঘণ্টার ঘুম প্রয়োজন হয়। তবে বুঝতে হবে—বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা আলাদা হতে পারে।

রাত জেগে কাজ করা, দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করা বা ঘুমানোর আগে চা-কফি পান করার অভ্যাস ঘুমের সময় ও মানের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিদিনের কাজের চাপের মধ্যে ঘুমকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতির ফলে মনোযোগ, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দিনের কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সকালে প্রাকৃতিক আলোতে থাকুন

ঘুম থেকে ওঠার পর দিনের আলো শরীরকে জেগে থাকার সংকেত দিতে সাহায্য করে। আলো আমাদের শরীরের জৈবঘড়ি এবং ঘুম-জাগরণ চক্র নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে দেওয়া, বারান্দায় কিছুক্ষণ থাকা বা বাইরে হালকা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। তবে সূর্যের আলো পাওয়ার জন্য ঘুম কমিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

যাদের কাজের কারণে খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে উঠতে হয়, তারা ঘরে পর্যাপ্ত আলো জ্বালাতে পারেন। ধীরে ধীরে আলো বাড়ে, এমন বিশেষ অ্যালার্মও কারও কারও ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।

ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে সময় দিন

ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই শরীর ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি সতর্ক হয়ে ওঠে না। এই সাময়িক অবস্থাকে স্লিপ ইনর্শিয়া বলা হয়। এ সময় মাথা ভার লাগা, ঝিমুনি, মনোযোগের ঘাটতি বা কাজে গতি পেতে দেরি হতে পারে।

স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত এই অনুভূতি ১৫ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে কমে আসে সাভাবিকভাবে। তবে ঘুমের ঘাটতি বা কিছু ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রে এটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

ঘুম থেকে উঠে পর্দা সরিয়ে আলো ঢুকতে দেওয়া, মুখ ধোয়া, পানি পান করা এবং হালকা হাঁটাচলা করা সকালে সতেজ হতে সাহায্য করতে পারে। ঘুম থেকে উঠেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়ার আগে নিজেকে পুরোপুরি সতর্ক হওয়ার কিছুটা সময় দিন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি প্রতিদিন সকালে তীব্র ক্লান্তি থাকে, দিনের বেলায় বারবার ঘুম পায় কিংবা ঘুম থেকে উঠতে অস্বাভাবিক কষ্ট হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, সকালে মাথাব্যথা কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রার মতো উপসর্গ থাকলে ঘুমের কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা দরকার হতে পারে।

অ্যালার্ম ঘড়ি সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে সাহায্য করে। কিন্তু অতিরিক্ত জোরে অ্যালার্ম, বারবার স্নুজ করা এবং পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার অভ্যাস সকালে অস্বস্তি ও ঝিমুনি বাড়াতে পারে। সকালে সতেজ থাকতে অ্যালার্মের ওপর নির্ভর করার পাশাপাশি নিয়মিত ঘুমানোর সময় ঠিক করুন, প্রাপ্তবয়স্ক হলে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের সুযোগ রাখুন এবং ঘুম থেকে ওঠার পর দিনের আলোতে থাকার চেষ্টা করুন।

অ্যালার্ম ঘড়িকে স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি প্রাণঘাতী ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করাই সুস্থভাবে দিন শুরু করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডিয়ামে ‘Why Your Alarm Clock Is Killing You, and How You Can Fix It’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।