মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মাহাতাব কাইয়ুম অত্যন্ত গভীর মনোযোগের সাথে তাঁর সামনে বসে থাকা রোগীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রোগীটি তাঁর বেশ পরিচিত মনে হলেও ঠিক কোথায় দেখেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে মনে করতে পারছিলেন না তিনি।

রোগীটি অত্যন্ত বিষণ্ন স্বরে কথা বলে উঠলেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমার কিছু ভালো লাগে না। আমি আর কিছুতেই আনন্দ পাই না।’

তার কথা শুনে ডাক্তার পরামর্শ দিলেন, ‘এ দেশের বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা ক্রো দ্য কাক্কুর অনুষ্ঠান দেখুন। লোকটা মানুষকে হাসাতে হাসাতে মেরে ফেলে।’

এই কথা শুনে রোগীটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাতর গলায় বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, আমিই সেই কৌতুকাভিনেতা ক্রো দ্য কাক্কু।’

এই কথা শোনার পর ডাক্তার মুহূর্তেই তাঁর রোগীকে চিনতে পারলেন। তিনি রোগীর দিকে তাকিয়ে হো হো করে হাসতে শুরু করলেন। অন্যদিকে রোগীটি তখন মহা টেনশনে নিমগ্ন। হাসতে হাসতে ডাক্তারের চোখে পানি চলে এল। তিনি বললেন, ‘ফাইলে আপনার অন্য নাম লেখা আছে!’

এর উত্তরে রোগী জানালেন, ‘ফান শো করার জন্য নিজের নাম ক্রো দ্য কাক্কু রেখেছি।’

ডাক্তার আবারও হো হো করে হাসতে শুরু করেন, তবে হঠাৎ করেই তিনি থেমে গেলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘আপনার জন্য বিশেষ মন্ত্র আছে। আনন্দে থাকার পঞ্চমন্ত্র। মেনে চলবেন।’

ডাক্তারের দেওয়া প্রথম মন্ত্রটি হলো: স্বাধীন থাকুন।
চাকরি হারিয়েছেন কিংবা চাকরি পাচ্ছেন না? তার অর্থ হলো আপনি একজন স্বাধীন মানুষ। ব্রেকআপ হয়ে গেছে? নিজেকে মুক্ত ও স্বাধীন হিসেবে ভাবুন। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা নেই? আপনি নিশ্চিতভাবেই টাকার মায়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত হয়ে গেছেন। বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না? বুঝতে হবে আপনি নিজের অজান্তেই যাযাবর জীবনে প্রবেশ করছেন, যা অনেকে সাধনা করেও পায় না। এবার বুক ভরে শ্বাস নিন। আপনি স্বাধীন! শুধু পাওনাদারদের কথায় কান দেবেন না, কারণ তারা আপনার স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য বুঝবে না।

দ্বিতীয় মন্ত্রটি হলো: জানুন সমস্যা বলে কিছু নেই।
বাড়িওয়ালা ভাড়া চাইলে ফোন সাইলেন্ট করে রাখুন অথবা বাসা বদলে ফেলুন। পাওনাদার যদি দরজায় এসে দাঁড়ায়, তবে ঘরে আছেন এমন কোনো শব্দ করবেন না। ফোন করলে নম্বর বদলে ফেলুন। অফিসের বস যদি আপনাকে খুঁজে বেড়ান, তবে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিন, ‘নিজেকে হারায়ে খুঁজি।’ বস মেসেজ পাঠালে তা সিন করবেন না। যদি ভুল করে সিন হয়ে যায়, তবে রিপ্লাই দিন, ‘বস, কাজের সঙ্গে আমার ভুল-বোঝাবুঝি চলছে।’ দেখবেন, সমস্যার সাথে আপনার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

তৃতীয় মন্ত্রটি হলো: বাজার বর্জন করুন।
বাজারে গিয়ে দেখলেন পকেটের টাকা দিয়ে মাছ কিনলে ডিম কেনা হবে না, আর ডিম কিনলে তেল হবে না। তখন বাজার না করে ‘দাদখানি চাল, মসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ, দু’টি পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিম-ভরা কৈ’ আওড়াতে আওড়াতে বাড়ি ফিরে আসুন। সদাই কোথায় জানতে চাইলে বলুন, ‘বাজারে প্রচণ্ড ভিড়। ভিড়ের ভেতর বাজার করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পরিবারের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় আজ বাজার বয়কট করেছি।’ এভাবে সুস্থ থাকুন এবং বাজার বর্জন করুন।

চতুর্থ মন্ত্রটি হলো: প্রকৃতির কোলে ফিরুন।
বিদ্যুৎ চলে গেলে বিরক্ত হবেন না, বরং প্রকৃতির কাছে আসুন। ঘরের দরজা-জানালা খুলে দিন। ফ্যান কিংবা এসির বদলে খোলা বাতাস গায়ে মাখুন। মশার সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া—উফফ, প্রকৃতির কী দারুণ উপহার! কেউ যদি গরমে অতিষ্ঠ হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করে, তবে তাকে বলুন, ‘শহুরে জীবন ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার জন্য মানুষ কত টাকা খরচ করে, আর আমরা বিনা খরচে প্রকৃতির কোলে ফিরে এসেছি! আহা, কী আনন্দ গরমে-মশাতে।’

পঞ্চম মন্ত্রটি হলো: মন খারাপ হলে গুগলে সার্চ দিন—‘মন ভালো করার উপায়’।
খেয়াল করবেন গুগল বলবে, ‘ব্যায়াম করুন, গান শুনুন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান।’ তখন গুগলকে বলবেন, ‘মন ভালো করার উপায় চেয়েছি, নতুন করে কাজের তালিকা চাইনি!’ দেখবেন মন ভালো হয়ে গেছে। কারণ কাউকে ঝাড়ি দিতে পারলেই মন ভালো হয়ে যায়।

এরপর ক্রো দ্য কাক্কু আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি অত্যন্ত গরম চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি একজন ফালতু ডাক্তার। পড়াশোনা করে ডাক্তারি করছেন নাকি ভুয়া ডাক্তার। গাদা গাদা টাকা নিয়ে মানুষের সময় নষ্ট করা ছাড়া কাজের কাজ তো কিছুই পারেন না।’

অবাক বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আমাকে বকাবকি করছেন কেন?’

ক্রো দ্য কাক্কু উত্তর দিলেন, ‘আপনি খুব উন্নত ডাক্তার। উত্তমরূপে রোগীর চিকিৎসা করেন। আপনাকে ঝাড়ি দিয়ে আমার মন ভালো হয়ে গেছে। মনে আনন্দ পাচ্ছি। আনন্দ হারিয়ে গেলে আবার আসব।’

ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ডাক্তার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি তাঁর চেম্বার বদলে ফেলবেন এবং এখানে আর বসবেন না।