মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এবং এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের বিষয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। মূলত রোগের ধরন, এর তীব্রতা এবং পুনরায় রোগটি ফিরে আসার ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় যে একজন রোগীকে কতদিন ওষুধ সেবন করতে হবে। এটি মনে রাখা জরুরি যে, সব মানসিক রোগীকে সারা জীবন ওষুধ খেতে হয় না। যখন একজন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠেন, তখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ওষুধ বন্ধ করা সম্ভব।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যানুসারে, গুরুতর বিষণ্নতার ক্ষেত্রে ওষুধের কোর্স ছয় মাস থেকে শুরু করে দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, ওসিডির (OCD) লক্ষণগুলো পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর আরও এক বছর ওষুধ সেবন করে তা বন্ধ করা যায়। তবে ক্রনিক সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল সমস্যায় জীবনব্যাপী ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অনেকের মনে ভয় কাজ করে। কিছু ওষুধের প্রভাবে শুরুর দিকে ঘুম বা ঝিমুনিভাব অনুভূত হতে পারে। তবে অধিকাংশ ওষুধের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না এবং সব রোগীর ক্ষেত্রেও এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। যদি কোনো ওষুধে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তবে রোগীকে সতর্ক করা হয় যেন তিনি নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ না করেন। বরং চিকিৎসকের সাথে কথা বলে ওষুধের ডোজ পরিবর্তন, সেবনের সময় পরিবর্তন অথবা বিকল্প ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।

ওজন বৃদ্ধি নিয়েও প্রচলিত কিছু ধারণা রয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ, যেমন কিছু অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের প্রভাবে খিদে বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে ওজন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। তবে সব ধরনের মানসিক রোগের ওষুধের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না।

বেশির ভাগ মানসিক রোগের মূল কারণ হিসেবে মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক পদার্থের ভারসাম্যহীনতাকে চিহ্নিত করা হয়। ওষুধ মূলত এই রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়া, গুরুতর বিষণ্নতা, ওসিডি, এডিএইচডি, অ্যাংজাইটি এবং বাইপোলার ডিজঅর্ডারের চিকিৎসায় ওষুধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব রোগীর জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি এক নয়। সম্পর্কের জটিলতা, আচরণের সমস্যা, মৃদু বিষণ্নতা কিংবা ফোবিয়ার মতো মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়ে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপির গুরুত্ব অনেক বেশি।

অনেকে মনে করেন মানসিক রোগ নিরাময় সম্ভব নয়, যা একটি বড় ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, বেশির ভাগ মানসিক রোগেরই কার্যকর চিকিৎসা বিদ্যমান। সঠিক রোগনির্ণয়, উপযুক্ত ওষুধের ব্যবহার, সাইকোথেরাপি, জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন, মাদক বা নেশা থেকে দূরে থাকা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপের মাধ্যমে অনেক মানসিক রোগীই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

— অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ