দীর্ঘ দুই বছর ধরে চরম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী অনুপমা পরমেশ্বরন। এই কঠিন সময়ে তিনি নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং নিজের সম্পর্কে ধারণাও বদলে গিয়েছিল তাঁর। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, এক পর্যায়ে তিনি অভিনয় জীবন ছেড়ে দেওয়ার কথা পর্যন্ত ভেবেছিলেন। তবে বর্তমানে থেরাপি এবং আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। নিজের জীবনের এই নতুন শুরুর কথা বলে তিনি একে নাম দিয়েছেন ‘অনুপমা ২.০’।

মানুষের ইচ্ছা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বতন্ত্র পরিচয় যখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে, তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনুপমা পরমেশ্বরনের জীবনের গত দুই বছর ঠিক এমনই এক দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কেটেছে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, একটি সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

‘আই অ্যাম উইথ ধন্যা ভার্মা’ নামক একটি অনুষ্ঠানে নিজের অতীত সম্পর্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন অনুপমা। অভিনেত্রী নিজেই সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে ‘নার্সিসিস্টিক অ্যাবিউজ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই নির্যাতনের প্রভাব পড়েছিল তাঁর শরীর, মন, আত্মপরিচয় এবং এমনকি তাঁর পেশাগত অভিনয় জীবনের ওপরও।

‘আমি যেন ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছিলাম’—অনুপমার কথায়, ওই বিষাক্ত সম্পর্কের মধ্যে থাকতে থাকতে তিনি যেন নিজের স্বাভাবিক সত্তাকে হারিয়ে ফেলছিলেন। একজন মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার পরিবর্তে তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছেন। এই মানসিক চাপের কারণে তাঁর শারীরিক ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।

সম্পর্কের এই তিক্ত অভিজ্ঞতার গভীরে ঠিক কী ঘটেছিল, তা বুঝতে অনুপমার বেশ সময় লেগেছে। নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অভিনেত্রী জানান, সেটি হঠাৎ আবেগের বশে দেওয়া কোনো পোস্ট ছিল না। বরং এর পেছনে ছিল দীর্ঘ সময়ের তীব্র কষ্ট, গভীর আত্মসমালোচনা এবং নিজেকে পুনরায় বুঝে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা।

অনুপমার ভাষায়, ওই একটি পোস্টের পেছনে জমে ছিল দুই বছরের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। তিনি চেয়েছিলেন, নিজের এই অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার আগে নিজেকে কিছুটা সুস্থ করে তুলতে। যখন তিনি অনুভব করলেন যে, নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার মতো মানসিক শক্তিতে পৌঁছেছেন, তখনই বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

নিজের অভিজ্ঞতা বুঝতে একজন সহকর্মীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে জানান অনুপমা। অভিনেত্রী ম্যাডোনা সেবাস্টিয়ানকে নার্সিসিস্টিক অ্যাবিউজ নিয়ে কথা বলতে দেখে তাঁর তীব্র শারীরিক প্রতিক্রিয়া হয়। অনুপমা জানান, ভিডিওটি দেখার সময় তিনি কাঁপতে শুরু করেন, কারণ সেখানে বর্ণিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের জীবনের অনেক ঘটনার অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।

অনুপমা মনে করেন, এই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া অনেক মানুষই হয়তো বুঝতে পারেন না যে তাঁদের সঙ্গে আসলে কী ঘটছে। কেউ কেউ নিজের পরিস্থিতিকে সাধারণ সম্পর্কের টানাপোড়েন বলে ধরে নেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের প্রকৃত কারণ খুঁজে পান না। এই কারণেই তিনি বিশেষভাবে কথা বলতে চান তাঁদের সঙ্গে, যাঁরা একই ধরনের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু এখনো সেটিকে চিহ্নিত করতে পারেননি।

মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার পথটি অনুপমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে থেরাপির সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রথম দুবার তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। তবে পরবর্তীতে একজন উপযুক্ত থেরাপিস্টের সহায়তায় নিজের অভিজ্ঞতা বুঝতে এবং পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার পথে এগোতে শুরু করেন তিনি। বর্তমানে দুই মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে থেরাপি নিচ্ছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর কাছে এটি কেবল অতীতের কষ্ট ভুলে যাওয়ার চেষ্টা নয়, বরং নিজের অনুভূতি, প্রয়োজন এবং পরিচয়কে নতুন করে চেনার একটি প্রক্রিয়া।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। বিশেষ করে বিনোদন জগতের তারকাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে এলে তা নিয়ে নানা আলোচনা, জল্পনা কিংবা সমালোচনার আশঙ্কা থাকে। অনুপমার ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, তা সত্ত্বেও তিনি নিজের অভিজ্ঞতা সবার সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবনের এই চরম টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছিল অনুপমার পেশাগত জীবনেও। এক সময় তিনি অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। যে কাজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেই কাজ চালিয়ে যাওয়াও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল।

উল্লেখ্য, অনুপমা মালয়ালম সিনেমা ‘প্রেমাম’ দিয়ে ব্যাপক পরিচিতি পান। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটিতে মেরি জর্জ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। পরবর্তীতে তিনি তেলেগু, তামিল ও অন্যান্য দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকায় রয়েছে ‘এ এ আ’, ‘কার্তিকেয়া ২’, ‘টিল্লু স্কয়ার’ ও ‘বাইসন কালামাদান’।

নিজের জীবনের এই বর্তমান পর্যায়কে অনুপমা নাম দিয়েছেন ‘অনুপমা ২.০’। এই নামটির মাধ্যমে তিনি পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে বাঁচার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার গল্প নয়, বরং নিজের কণ্ঠ, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের ওপর নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই।

সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে দেওয়া একটি পোস্টে অনুপমা লিখেছিলেন, কখনো কখনো নিজের শান্তি ফিরে পেতে এমন কিছু থেকে সরে আসতে হয়, যা আর সামনে এগোনোর পথ তৈরি করে না। সেই পোস্টে তিনি নিজের কণ্ঠ ও জীবনকে বেছে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। ভয় কিংবা অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় না থেকে নিজের কাছে ফিরে আসার কথা উল্লেখ ছিল সেখানে।

পোস্টটি প্রকাশের পর নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন অভিনেত্রী। কেউ তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার যাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ নানা অনুমানের ভিত্তিতে মন্তব্য করেছেন। অনুপমার বক্তব্য, পোস্টটি দেওয়ার আগে তাঁকে দীর্ঘ সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে; তাই এর পেছনের অভিজ্ঞতা না জেনে মন্তব্য করা সহজ হলেও বিষয়টি তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না।