চিকিৎসা শুরুর সময়ের সামান্য পার্থক্যও একজন রোগীর জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে। একজন রোগী দেশে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেছেন, আর অন্যজন হয়তো ভিসার জন্য তিন মাস অপেক্ষা করেছেন। যদিও দুজনের রোগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা একই ছিল, কিন্তু সময়ের এই ব্যবধান বেঁচে থাকার সম্ভাবনায় বিশাল প্রভাব ফেলে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে প্রায় সব রোগীরই সুস্থ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় সময়ের এই অপরিসীম গুরুত্ব বোঝাতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান।
গত মঙ্গলবার মুক্তকণ্ঠ ও এসকেএফ-এর ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় ‘বিশ্বমানের ক্যানসার–চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। মুক্তকণ্ঠ ডটকমের আয়োজনে নাসিহা তাহসিনের উপস্থাপনায় পরিচালিত এই অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বগুড়ার টিএমএসএস ক্যানসার সেন্টারের কনসালট্যান্ট এবং মেডির্যাল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান।
অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারের বর্তমান পরিস্থিতি, রোগের বিভিন্ন ধরন, ঝুঁকির কারণসমূহ, প্রাথমিক লক্ষণ, স্ক্রিনিং ও রোগনির্ণয় পদ্ধতি, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, রেডিওথেরাপির সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসা পরবর্তী ফলোআপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আলোচনায় এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উঠে আসে যে, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারের পরিসংখ্যান নিয়ে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান বলেন, “দেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবোক্যানের অনুমানভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করা হয়। তবে চিকিৎসার বাস্তব অভিজ্ঞতায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়।”
বিশ্বব্যাপী এই রোগের প্রভাব আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে আক্রান্তদের প্রায় ৯৯ শতাংশই নারী এবং মাত্র ১ শতাংশ পুরুষ। এই রোগের প্রভাব কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি রোগীর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক শান্তি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
স্তন ক্যানসারের সঙ্গে জিনগত সম্পর্কের বিষয়ে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান জানান, স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো পারিবারিক বা জিনগত ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস এবং জিনগত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
এই প্রসঙ্গে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান আরও বলেন, “পরিবারের একাধিক সদস্যের স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, অল্প বয়সে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া, একই ব্যক্তির দুই স্তনে ক্যানসার হওয়া কিংবা পরিবারের কোনো পুরুষের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে জিনগত পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের ঝুঁকি নিরূপণ ও স্ক্রিনিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির কারণগুলো ব্যাখ্যা করে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান বলেন, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এছাড়া কম বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া, দেরিতে মেনোপজ হওয়া, সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, অধিক বয়সে প্রথম সন্তান গ্রহণ এবং স্তনের কিছু পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
এ বিষয়ে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর আরও বলেন, আগে রেডিওথেরাপি নেওয়ার ইতিহাস, হরমোনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং ধূমপানের মতো বিষয়গুলোও ঝুঁকির কারণ হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব ঝুঁকির কারণ থাকলেই যে সবার স্তন ক্যানসার হবে, তা নয়। তবে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থেকে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রোগ শনাক্তকরণে স্ক্রিনিং ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি। রোগনির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইমেজিং পরীক্ষা, যেমন ম্যামোগ্রাফি, আলট্রাসনোগ্রাফি ও ব্রেস্ট এমআরআই করা হতে পারে।
পরীক্ষায় সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে করণীয় সম্পর্কে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর আরও বলেন, টিস্যু বায়োপসি বা হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করা হয়। বায়োপসি নিয়ে অনেকের মনে ভয় থাকলেও এটি রোগের ধরন নির্ধারণ এবং যথাযথ চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান চিকিৎসা সুবিধা সম্পর্কে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান জানান, রোগের ধরন, পর্যায় এবং পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো ব্যবহৃত হয়।
তিনি উল্লেখ করেন যে, স্তন ক্যানসারের সব রোগীর চিকিৎসা এক রকম হয় না। ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর বলেন, ক্যানসারের আণবিক ধরন, হরমোন রিসেপ্টরের অবস্থা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ধরনের প্রয়োজনীয় জিনগত ও আণবিক পরীক্ষার সুবিধাও এখন দেশে বিদ্যমান।
ক্যানসারের পর্যায় এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া গেলে প্রায় সব রোগীরই সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রোগটি যদি শরীরের কাছাকাছি অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে। আর যদি তা দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তবে চিকিৎসার ফলাফল আরও প্রতিকূল হতে পারে।
ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান আরও বলেন, একই রোগে আক্রান্ত দুজন মানুষের ক্ষেত্রে কেবল চিকিৎসা শুরু করার সময়ের পার্থক্যও ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সে কারণে দেশে চিকিৎসা শুরু করতে অযথা দেরি করা উচিত নয়। দেশে চিকিৎসা শুরু করার পর প্রয়োজনে অন্য চিকিৎসকের মতামত নেওয়া যেতে পারে, তবে চিকিৎসার মাঝে বিরতি না দিয়ে যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু ও সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ডা. মোহাম্মদ তৌসিফুর রহমান বলেন, “স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা নেওয়াই এ রোগ মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।”