বিশ্বজুড়ে অক্টোবর মাসটি স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। এই সময়ে ব্যবহৃত গোলাপি ফিতাটি কেবল একটি প্রতীক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নারীদের নিজেদের শারীরিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার একটি জোরালো বার্তা।

নারীদের মধ্যে সব ধরনের ক্যানসারের মধ্যে স্তন ক্যানসার অন্যতম প্রধান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, নারীদের মধ্যে নতুন ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে স্তন ক্যানসারই সবচেয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে এই রোগ ধরা পড়লেই জীবন শেষ হয়ে যায়—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রোগটি যত দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং যত দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা যায়, সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।

কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন

স্তনের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে স্তনে নতুন কোনো শক্ত গুটি বা চাকা দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। এছাড়া স্তনের আকার বা আকৃতিতে কোনো পরিবর্তন আসা, স্তনের চামড়ায় টান পড়া, ডিম্পল বা গর্তের মতো পরিবর্তন লক্ষ্য করা, স্তনবৃন্তের আকৃতি পরিবর্তন হওয়া কিংবা তা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বিপদের সংকেত হতে পারে। স্তনবৃন্ত দিয়ে অস্বাভাবিক তরল, বিশেষ করে রক্তমিশ্রিত তরল বের হওয়া, স্তনের চামড়া লাল হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং বগলে গুটি বা লিম্ফ নোড বড় হয়ে যাওয়াকেও গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।

তবে মনে রাখা জরুরি যে, স্তনে গোটা মানেই ক্যানসার নয়। তবুও কোনো ধরনের গোটা বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন

সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি পারিবারিক ইতিহাস, নির্দিষ্ট কিছু জিনগত পরিবর্তন, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, অ্যালকোহল সেবন, ধূমপান, হরমোন-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় এবং পূর্বের কিছু চিকিৎসা বা রোগের ইতিহাস এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীরই কোনো পারিবারিক ইতিহাস থাকে না। তাই পরিবারে কারও এই রোগ নেই বলে নিজেকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত মনে করা সঠিক হবে না।

ঝুঁকি কমানোর উপায়

সব ধরনের স্তন ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার এবং সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানো স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

সময়মতো শনাক্তকরণের গুরুত্ব

স্তন ক্যানসারের মোকাবিলায় দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—প্রাথমিক রোগনির্ণয় এবং স্ক্রিনিং। কোনো নারী যদি নিজের স্তনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ম্যামোগ্রাফি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। রোগটি নিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রে নিডল বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে, যাদের কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ নেই, তাদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা ও সময় নির্ধারিত হয় বয়স, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঝুঁকি এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা বিবেচনা করে।

— ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, সার্জারি বিভাগ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ