ক্রিকেট খেলায় বলের রঙের বৈচিত্র্য অনেক। টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্যবাহী লাল বল, একদিনের ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সাদা বলের ব্যবহার এখন সবার জানা। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে গোলাপি বল, যা দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচে এখন নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, দিনের বেলার টেস্ট ম্যাচেও কি গোলাপি বল ব্যবহার করা সম্ভব? ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন এই সংস্করণে এমন একটি ভাবনা এখন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্ট ম্যাচে এই বিতর্ক আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ওই ম্যাচে প্রকৃতির প্রতিকূলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাধা। আলোর স্বল্পতার কারণে বারবার খেলা বন্ধ করতে হয়েছে। ক্রিকেটাররা মাঠ ছেড়ে ফিরে গেছেন এবং দর্শকরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থেকেছেন। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এই সমস্যার একটি সমাধান আগেই প্রদান করে রেখেছিল।
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, দিনের বেলার টেস্ট ম্যাচেও গোলাপি বল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। ম্যাচ শুরুর আগেই অংশগ্রহণকারী দুই দলকে এই বিষয়ে একমত হতে হবে। একবার যদি গোলাপি বল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে পুরো ম্যাচটিই সেই বল দিয়ে খেলতে হবে। খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পর লাল বল পরিবর্তন করে গোলাপি বল নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে ডারবানের ম্যাচে কোনো দলই এই সুযোগটি গ্রহণ করেনি।
কিংসমিডে প্রথম দিনের খেলায় মাত্র ৬৫ ওভার খেলা সম্ভব হয়েছে, যেখানে টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিদিন অন্তত ৯০ ওভার খেলার কথা। ফলে প্রথম দিনেই ২৫ ওভার হারিয়েছে ম্যাচটি। দ্বিতীয় দিনেও আলোর স্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই খেলা শেষ করতে হয়। অস্ট্রেলিয়া ৩৯০ রান করার পর দক্ষিণ আফ্রিকা ১ উইকেটে ২৭ রান তুলেছিল।
শেষ পর্যন্ত ২১৪ রানের বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে অস্ট্রেলিয়া। তবে জয়ের আনন্দের মাঝেও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে—গোলাপি বল ব্যবহার করলে কি এত পরিমাণ ক্রিকেট হারিয়ে যেত?
লাল বলের পরিবর্তে গোলাপি বল বেছে নেওয়াটা অনেকের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। বিশেষ করে ফ্লাডলাইটের নিচে বলটির আচরণ কেমন হবে এবং বলটি পুরনো হলে কী ঘটবে, তা নিয়ে নানা সংশয় রয়েছে। শুরুতে শোনা গিয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার অনীহার কারণে ডারবানে গোলাপি বল ব্যবহৃত হয়নি। কিন্তু ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডের বক্তব্যে বোঝা গেছে, অস্ট্রেলিয়াও এই বলের পক্ষে ছিল না।
ম্যাকডোনাল্ডের আপত্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেন, “আমার এটা পছন্দ নয়। লাল বলের বদলে গোলাপি বল ব্যবহার করাটা আমার কাছে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। সত্যি বলতে, আমাদের উত্তর “না”।” তাঁর এই আপত্তির মূল কারণ হলো গোলাপি বলের আচরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা। লাল বলের তুলনায় গোলাপি বলের বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর আচরণ কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং ফ্লাডলাইটের আলোয় এটি কতটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।
ম্যাকডোনাল্ডের ভাষায়, “লাল বলের বদলে গোলাপি বল নেওয়াটা আমার কাছে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ফ্লাডলাইটের নিচে বলটি কেমন আচরণ করবে, গোলাপি বল কতটা পুরোনো হলে কী হবে, এসবের অনেক দিক আছে।”
তবে তিনি অন্য দলগুলোকে গোলাপি বল ব্যবহার না করার কোনো পরামর্শ দেননি; সিদ্ধান্তটি তাদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, “অন্যরা এ নিয়ে বিতর্ক করতে পারে; কিন্তু আমাদের উত্তর না।”
কোচ ম্যাকডোনাল্ড যেখানে ঝুঁকি দেখছেন, সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক শন পোলক দেখছেন সম্ভাবনা। তাঁর মতে, বলের রঙের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাঠে কতক্ষণ খেলা হচ্ছে। সুপারস্পোর্টের ধারাভাষ্যে পোলক বলেন, “আমি এক মুহূর্তের জন্যও বলছি না যে আমাদের গোলাপি বলে দিনরাতের ম্যাচ খেলা উচিত ছিল। আমি শুধু মনে করি, দিনের ম্যাচটিই গোলাপি বলে খেলা উচিত ছিল।”
পোলকের যুক্তি ছিল ভিন্ন। তিনি মনে করেন, গোলাপি বল নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে এক ধরনের অমূলক ভয় কাজ করে। গোলাপি বলে ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটলে সবাই বলের দোষ খোঁজে, আবার ব্যাটসম্যানরা রান করলে বলা হয় বল নরম হয়ে গেছে। অথচ লাল বলের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটলে তা ক্রিকেটের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই গণ্য হয়।
ডারবান টেস্টের উদাহরণ দিয়ে পোলক বলেন, প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর এক পর্যায়ে ৬ উইকেটে ১২৪ রান ছিল, যেখান থেকে তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩৯০ রান করেছে। পোলকের প্রশ্ন, এই ম্যাচটি যদি গোলাপি বলে হতো, তবে কী বলা হতো? তাঁর উত্তর, “অস্ট্রেলিয়া যখন ৬ উইকেটে ১২৪ রানে ছিল, তখন যদি গোলাপি বলে খেলা হতো, সবাই বলত, এটা গোলাপি বলের দোষ।”
এরপর অস্ট্রেলিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাখ্যাও নিশ্চয়ই বলের মধ্যেই খোঁজা হতো। বলা হতো, গোলাপি বল নরম হয়ে যাওয়ার কারণেই ব্যাটসম্যানরা এত রান করতে পেরেছেন। পোলকের বক্তব্যের মূল কথা হলো, লাল বলকে আমরা যে ছাড় দিই, গোলাপি বলকে সেই ছাড় দিতে চাই না।
পোলকের দাবি, আলোর স্বল্পতায় খেলা চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারত গোলাপি বল। তিনি বলেন, “গোলাপি বল ব্যবহার করলে আমরা আরও ৪৫ ওভার টেস্ট ক্রিকেট দেখতে পেতাম।”
৪৫ ওভার মানে একদিনের নির্ধারিত খেলার ঠিক অর্ধেক। টেস্ট ক্রিকেটে এই সময়ে অনেক কিছু ঘটতে পারে—কোনো দল ধসে পড়তে পারে, কেউ সেঞ্চুরি করতে পারেন অথবা বিকেলের কয়েকটি উইকেটে পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারে। তাই পোলক ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “গোলাপি বল ব্যবহার করতে ভয় পাবেন না।” তিনি শুধু কথা বলেননি, বরং লাল, গোলাপি ও কমলা বল আকাশে ছুড়ে দেখিয়েছেন যে, লাল বলের তুলনায় গোলাপি ও কমলা বল আকাশে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
ম্যাকডোনাল্ডের আশঙ্কা ছিল বলের আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে পাঁচ দিনের টেস্টে এটি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে পোলকের যুক্তি হলো, সেই আশঙ্কায় যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকে, তবে লাভ কী?
আসলে এই বিতর্কটি কেবল বলের রঙের নয়, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্য, ক্রিকেটারদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস এবং সময়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন। ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া আইসিসির নতুন প্লেয়িং কন্ডিশনে দিনের টেস্টেও গোলাপি বল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে দুই দলের সম্মতি বাধ্যতামূলক এবং ম্যাচের মাঝপথে বলের রং বদলানো সম্ভব নয়।
এই নিয়মের মধ্যেই সমস্যাটি লুকিয়ে আছে। ম্যাকডোনাল্ডের আশঙ্কা, গোলাপি বলের আচরণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে পাঁচ দিনের টেস্টে সেটি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে পোলকের যুক্তি, সেই আশঙ্কায় যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রিকেটই বন্ধ থাকে, তাহলে লাভটা কী?
এখন সবার নজর দ্বিতীয় টেস্টের দিকে। ১৮ অক্টোবর গেবেরহায় শুরু হবে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় টেস্ট। এরপর কেপটাউনে সিরিজের শেষ ম্যাচ। সেখানেও যদি আকাশ মেঘলা থাকে এবং আলো কমে আসে, তবে আবারও গোলাপি বলের প্রসঙ্গটি সামনে আসবে। তবে দুই দল ম্যাচ শুরুর আগে একমত না হলে গোলাপি বলকে অপেক্ষাতেই থাকতে হবে।