প্রয়াত স্যার গারফিল্ড সোবার্সের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলা যায়—জ্যাক ক্যালিস অনেকের দৃষ্টিতে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। এই তালিকায় রয়েছেন ক্রিকেট বিশ্বের অনেক কিংবদন্তিও। গত মে মাসে ক্রিকইনফোর একটি বিশেষজ্ঞ জুরি প্যানেলের ভোটে একবিংশ শতাব্দীর সেরা পুরুষ অলরাউন্ড ক্রিকেটার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ক্যালিস। এই প্যানেলে ওয়াসিম আকরাম, গ্রেগ চ্যাপেল, ম্যাথু হেইডেন, এউইন মরগান, রবি শাস্ত্রী এবং ড্যানিয়েল ভেট্টোরির মতো সাবেক তারকা ক্রিকেটাররা yerছিলেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৫ হাজারেরও বেশি রান, ৬২টি সেঞ্চুরি এবং ৫০০-এর বেশি উইকেটের মালিক ক্যালিসের আজ ৫১তম জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে তাঁর সম্পর্কে ভারতের কিংবদন্তি রাহুল দ্রাবিড়ের লেখাটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো, যা তিনি গত মে মাসে ক্রিকইনফোর জন্য লিখেছিলেন।

ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে গঠিত জুরি প্যানেল জ্যাক ক্যালিসকে এই শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটার হিসেবে নির্বাচন করায় আমি মোটেও অবাক হইনি। আমাদের খেলার সর্বোচ্চ স্তরে ক্যালিস যা অর্জন করেছেন, তা কতটা কঠিন, সেটি সম্ভবত অন্য যে কারও চেয়ে ক্রিকেটাররাই বেশি উপলব্ধি করতে পারেন।

"আমাদের ব্যাটিং ক্যারিয়ার ছিল প্রায় একই রকম। ক্যালিস আমার চেয়ে দুটি টেস্ট বেশি খেলেছে এবং মাত্র এক রানে এগিয়ে। আমি তিনে ব্যাট করতাম, সে তিনে ও চারে। দুজনেই স্লিপে ফিল্ডিং করেছি; আমি তার চেয়ে ১০টি ক্যাচ বেশি নিয়েছি। রান করা এবং ক্যাচ নেওয়াটা মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে কতটা ক্লান্তিকর ছিল, তা আমি খুব ভালোভাবেই জানি। অথচ ক্যালিস একই সঙ্গে পেস বোলারও, টেস্টে প্রায় ৩০০ উইকেট (২৯২) আছে।"

অন্যান্য মহান অলরাউন্ডারদের মতো নিচের অর্ডারে নয়, বরং টপ অর্ডারে ব্যাটিং করতেন ক্যালিস। দীর্ঘ সময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার পেস বোলিং আক্রমণের প্রাচুর্যের কারণে তাঁকে খুব বেশি বোলিং করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে টেস্ট প্রতি গড়ে ২০ ওভার বল করলেও ক্যালিস কোনো সাধারণ বোলার ছিলেন না। একজন সফল পেস বোলারের সব গুণই তাঁর ছিল—সুইং, সিম, নিয়ন্ত্রণ, বিধ্বংসী বাউন্সার এবং দলের প্রয়োজনে গতি বাড়ানোর ক্ষমতা। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত উইকেটশিকারি। যদি এত উপরে ব্যাটিং করতে না হতো, তবে সর্বকালের অন্যতম সেরা পেসার হিসেবেও তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হতে পারত।

মাঠের ভেতরে ক্যালিস ছিলেন অত্যন্ত মিতভাষী এবং মাঠের বাইরেও বেশ অন্তর্মুখী। আইপিএল শুরুর দিকে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে একসঙ্গে খেলার সময় আমি তাঁকে সত্যিকার অর্থে চিনতে পেরেছি। ড্রেসিংরুমে আমি বুঝেছিলাম যে ক্যালিস আসলে খোলামেলা ও মিশুক মনের মানুষ, তবে তিনি কেবল নিজের মতো থাকতে পছন্দ করেন।

সেই সময়ে আমার বয়স এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ফিট থাকার জন্য আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হতো। ম্যাচ শেষে আইস বাথসহ বিভিন্ন রিকভারি রুটিনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। কিন্তু ক্যালিসের ক্ষেত্রে সেসবের খুব একটা প্রয়োজন হতো না। তাঁর অসাধারণ শারীরিক ফিটনেস ছিল প্রকৃতিপ্রদত্ত এবং শক্তি ছিল সহজাত। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ছোটবেলায় তিনি প্রচুর জিম ও ফিটনেস ট্রেনিং করেছেন এবং সেই সময়ে তাঁর বাবার কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছেন, যার ফল তিনি ক্যারিয়ারে পেয়েছেন। এরপর তাঁর অনুশীলন ছিল মূলত দক্ষতাকেন্দ্রিক। প্রায় প্রতি সেশনেই তিনি ব্যাটিং, বোলিং এবং ক্যাচ অনুশীলন করতেন।

প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়, সে বিষয়ে তাঁর পরিষ্কার ধারণা ছিল। তাঁর প্রস্তুতি এবং দক্ষতা অর্জনের ধরন দেখে বোঝা যেত যে, খেলায় নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড স্থাপনের পাশাপাশি তিনি নির্দিষ্ট কিছু অর্জন করতে চান এবং সেই লক্ষ্যগুলোর জন্যই নিরলস কাজ করে যান।

ক্যালিসের সবকিছু দেখে খুব সহজ মনে হতো, কিন্তু তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী সত্তা। ততদিনে টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেট তাঁর হাতের তালুর মধ্যে ছিল। তবে আইপিএল ক্যারিয়ারের শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি। দর্শকদের কাছে এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে পেরে সেই বয়সেও তিনি একজন দক্ষ টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটার হয়ে ফিরে এসেছিলেন।

"(আইপিএলে) প্রথম বছরটি ভালো না যাওয়ায় নিশ্চয়ই তার খারাপ লেগেছিল। কিন্তু ফিরে এসেছিল হাতে আরও অনেক শট নিয়ে। তবে সবচেয়ে বড় কথা, বোলার হিসেবে তার তৃণে আরও বৈচিত্র্য যোগ হয়। বল হাতে আরও বেশি অবদান রাখতে শুরু করে আমাদের হয়ে এবং পরবর্তী সময়ে কলকাতা নাইট রাইডার্সে। আইপিএল জিতেছে তাদের সঙ্গে। একবার ভাবুন তো, ক্যারিয়ারের একদম শেষ দিকে এসে খেলা এই সংস্করণেই সে যদি এত ভালো হয়, তাহলে সারা জীবন ধরে যেসব সংস্করণের জন্য অনুশীলন করেছে, সেগুলোতে কত ভালো ছিল!"

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ ক্যালিস সব ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাট করতে পারতেন। খেলায় তাঁর কোনো দৃশ্যমান দুর্বলতা ছিল না, তাই বিশেষ কোনো পরিকল্পনায় তাঁকে আটকানো সম্ভব ছিল না। ইনিংসের শুরুতে অফ স্টাম্প টার্গেট করে দেখতে হতো ফুল লেংথের বল ব্যাটে মিস করানো যায় কি না। একবার থিতু হয়ে গেলে তাঁকে আউট করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি খুব একটা ভুল করতেন না, তাই তাঁকে আউট করতে হলে খুব ভালো বল করতে হতো—যা বোলারের শারীরিক ও মানসিক শক্তি অনেকটাই শুষে নিত। আসলে ক্যালিসের বিপক্ষে খেলাটা ছিল যেন কোনো দুর্দান্ত টেনিস খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হওয়া। ব্যাটিংয়ের সময় প্রচুর ভালো বল করতে হতো আর বোলিংয়ের সময় প্রতিপক্ষকে খেলতে হতো অসাধারণ সব শট।

প্রয়োজন বুঝে খেলায় তাঁর গতি পাল্টানোর অসাধারণ ক্ষমতাকে আমি সত্যিই প্রশংসা করি। কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশনে তিনি রক্ষণাত্মক ব্যাটিং করতে পারতেন। আবার খেলার নিয়ন্ত্রণ নিতে বোলারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হলে তিনি সময় নষ্ট করতেন না। ২০১১ সালে কেপ টাউনে হরভজন সিংয়ের বিপক্ষে এবড়োখেবড়ো পিচে রিভার্স সুইপ করে এবং সেই কঠিন উইকেটে দুটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ক্যালিস ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। আমরা দুবার সিরিজ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে কেপ টাউনে গিয়েছি এবং দুবারই বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল ক্যালিসের।

দীর্ঘ ১৮ বছর—যার মধ্যে ১৩টি বছর এই শতাব্দীতে—ক্যালিস ছিলেন উৎকর্ষ ও সর্বোচ্চ তীব্রতার প্রতীক। এর বাইরে অন্য কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল না। ব্যাটিং ও বোলিং ছাড়াও স্লিপে ফিল্ডিং করার জন্য প্রতিটি বলে চরম মনোযোগের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যেভাবে খেলে গেছেন, তার জন্য অফুরন্ত মানসিক শক্তির ভান্ডার প্রয়োজন এবং সেটি তাঁর ছিল। সর্বোপরি, ক্রিকেট খেলার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর।