চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার এক ওয়ার্ডের কয়েকটি মহল্লায় মাদক কারবারের অভিযোগে ৩৮ জনের নামের তালিকা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, রেলবস্তি ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক কেনাবেচা চলে। মাদক বিক্রিতে নারীদের ব্যবহারের অভিযোগের পাশাপাশি রেলস্টেশন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদক কারবারিরা অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পুরুষ সদস্যরা চাহিদা অনুযায়ী গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে ছোট ছোট প্যাকেটে প্রস্তুত করে রাখে। এরপর পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে এবং নিজেদের আড়াল করতে রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ নারীদের হাতে সেই মাদক তুলে দেওয়া হয়। মাদক ক্রেতারা টাকা পরিশোধ করলেই নারীরা সরবরাহ করে থাকে। মাদক বিক্রির কাজে নারীদের এভাবে সামনে ব্যবহার করা এই চক্রের একটি সুপরিচিত কৌশল।
দিনের অনেকটা সময় ধরে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচায় মাদকাসক্তদের আনাগোনায় পুরো এলাকার সামাজিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া উঠতি বয়সের যুবকেরা প্রতিদিন মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় এসে সহজেই মাদক সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে।
ডিসি-এসপির টেবিলে ৩৮ জনের তালিকা
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এলাকার সচেতন নাগরিক ও এলাকাবাসী যৌথ অনুসন্ধান চালিয়ে চিহ্নিত ৩৮ জন মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করেছেন। ইতিমধ্যে সেই তালিকা জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার এবং জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় থাকা চিহ্নিত কারবারিদের মধ্যে সরাসরি ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন—আলাউদ্দীন চাইনিজের পেছনের রমজান, স্টেশন রোড প্রান্তিকপাড়ার মজি, সুমন, হাসান তারেক ওরফে পাতান, মিলন ও সোহান; জিয়ানগরের আকাশ, সাগর ও রিপন এবং স্টেশন রোডের চান্দু, সাজু, ইমন, রবিন, কুতুব ও মোহা. রাসেল। এছাড়া গাঁজা বিক্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন—আলাউদ্দীন চাইনিজের পেছনের আরিফ, স্টেশন রোড হাড্ডিপট্টির বিপ্লব এবং জিয়ানগরের সেলিম। চণ্ডীতলা এলাকায় সরাসরি বাংলা মদ ও ইয়াবা বিক্রি করছেন তপন।
অন্যদিকে একাধিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আলাউদ্দীন চাইনিজের পেছনের সোনাদ্দী নেশাজাতীয় স্কাপ সিরাপ বিক্রি করছেন। এছাড়া স্টেশন রোড প্রান্তিকপাড়ার রুবেল ইয়াবা ও হিরোইন; রেলবাগান এলাকার বিপ্লব ইয়াবা ও গাঁজা এবং হাড্ডিপট্টির এসাহাক হিরোইন ও গাঁজার কারবারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এসব চিহ্নিত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হোক।
ঢাল বানানো হচ্ছে নারীদের
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে মাদক বিক্রির কাজে নারীদের সামনে রাখা হয়। তাদের দাবি, ক্রেতারা এলে নারীরা মাদক সরবরাহ করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের ব্যাপ্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাদকবিরোধী অভিযানে এক নারীকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ১৪ অক্টোবর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার জিয়ানগরের হাড্ডিপট্টিতে অভিযান চালিয়ে মোসা. কবিতা খাতুন (৩১) নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় তার কাছ থেকে ১০টি ইয়াবা বড়ি ও ১ হাজার ৯৬০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের সময় তার স্বামী মো. বিপ্লব হোসেন (৩৭) পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। এ ঘটনায় অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। এর আগের দিন একই এলাকায় মাদকসহ আরেক দম্পতিকে আটকের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তালিকায় থাকা অন্যান্য নারী মাদক কারবারিদের মধ্যে আলাউদ্দীন চাইনিজ পেছনের সাবিনা ও শিরিন এবং স্টেশন রোড প্রান্তিকপাড়ার রিতা, রুমি, লাইলা ও অঞ্জলী সরাসরি ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এছাড়া একই এলাকার সেলিনা বেগম ও শুকরন এবং হাড্ডিপট্টির ওজু হিরোইন বিক্রির সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। গাঁজা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন জিয়ানগরের সিমা ও মোসা. আলেয়া। চণ্ডীতলা এলাকায় অনিমা ও পারুল যৌথভাবে বাংলা মদ ও ইয়াবা বিক্রি করছেন। পাশাপাশি প্রান্তিকপাড়ার সানুয়ারা ইয়াবা ও গাঁজা এবং সিমা ইয়াবা ও হিরোইনের কারবারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগের পাশাপাশি ছিনতাইয়ের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মারুফের অভিযোগ, সম্প্রতি একদিন ভোরে বনলতা ট্রেনে ঢাকায় যাওয়ার জন্য স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় মূল ফটকের আগে কয়েকজন তাঁর পথ আটকান। তাঁদের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকায় তিনি নিজের জিনিসপত্র দিয়ে দিতে বাধ্য হন।
আব্দুল্লাহ আল মারুফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি একা নই, নিয়মিতই যাত্রীরা এই এলাকার এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।’
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, মাদকসেবীদের উৎপাতের কারণে নারীরাও রাস্তায় হয়রানির শিকার হন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘটনা ও অভিযোগকারীদের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার ওবায়দুল্লাহ বলেন, স্টেশনের ভেতরে থাকাকালে যাত্রীরা নিরাপদ থাকেন বলে তার ধারণা। তবে স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর যাত্রীরা ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়, যা উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রেলবস্তির প্রান্তিকপাড়ায় দুটি পুকুরের মধ্যবর্তী সড়কসহ কয়েকটি স্থানে প্রকাশ্যে গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইন বিক্রি হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, মাদক বিক্রির এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যদের নজরে আসার কথা। তার অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
শফিকুর রহমান নামের এক বাসিন্দা বলেন, ওই এলাকা থেকে কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ মাদক সংগ্রহ করে সেবন করছেন। এতে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাদকের অর্থ জোগাতে কেউ কেউ চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জিয়ানগরসহ আশপাশের মহল্লার গ্রামপ্রধান জিয়াউর রহমান বলেন, এলাকায় মাদক কারবার বেড়ে যাওয়ায় সচেতন নাগরিকদের নিয়ে তারা কর্মসূচি পালন করেছেন। এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি ও মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকা জমা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এর পর এলাকায় মাদক কারবারিদের তৎপরতা কিছুটা কমেছে।
জিয়াউর রহমান আরও বলেন, আগেও তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় মাদক কারবার আবার বেড়ে যায় বলে তাদের অভিযোগ। এবার কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, পৌর এলাকার রেলস্টেশনসংলগ্ন মহল্লাগুলোয় মাদক কারবার হয়। এ কাজে নারী-পুরুষ উভয়ের জড়িত থাকার তথ্য তাঁদের জানা আছে। এসব এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হয়।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার ও বুধবার পৌর এলাকার প্রান্তিকপাড়া এবং জিয়ানগরের হাড্ডিপট্টিতে অভিযান চালিয়ে মাদকসহ দুজন পুরুষ ও একজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীন আকন্দ বলেন, সম্প্রতি ওইসব এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, মাদক ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে জেলাজুড়ে বিশেষ অভিযান চলছে। থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মাদক উদ্ধারে কাজ করছে। মাদক কারবারের তথ্য পাওয়া গেলে অভিযান চালানো হবে বলে জানান তিনি।