সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গামন্দিরে প্রতিমার গা থেকে একে একে খুলে ফেলা হয়েছে দেশলাইয়ের কাঠি। মেঝেতে স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাঠিগুলো। কাঠির পরিবর্তে সেখানে বসছে তিল ও কিশমিশ।
দেড় লাখের বেশি দেশলাইয়ের কাঠি ও রেশমি সুতায় সাজানো এই প্রতিমা ভক্তদের মন কেড়েছিল। কিন্তু অগ্নিঝুঁকির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে দেশলাইয়ের কাঠির সাজ পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, ‘এত অল্প সময়ে নতুন সাজ তৈরি করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।’ তবু হাল ছাড়েননি তিনি। ৪০ কেজি তিল, ১০ কেজি কিশমিশ আর ১০ জন কারিগর নিয়ে নেমে পড়েছেন কাজে। রেশমি সুতার সাজ থাকছে আগের মতোই।
আজ বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ২২ মিনিটে নবদ্বীপ তাঁর ফেসবুক পোস্টে জানান, কাজ চলছে। নতুন সাজের প্রতিমা দেখতে ভক্তদের আমন্ত্রণও জানান তিনি।
শুধু ব্রহ্মরাজপুরে নয়, এবার সাতক্ষীরার বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা সাজাতে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচলিত উপকরণের বাইরের জিনিস। আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সর্বজনীন দুর্গামন্দিরে ৩৫ হাজার মুক্তা–পুঁতিতে সাজানো হয়েছে ১৩টি প্রতিমা। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, মহিষাসুর, এমনকি সিংহও বাদ যায়নি। সোনালি মুকুট ও রঙিন অলংকারের সঙ্গে সাদা মুক্তার আভা প্রতিমাগুলোকে দিয়েছে আলাদা রূপ।
গত মঙ্গলবার বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে মন্দিরটিতে গিয়ে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত শিল্পীরা। কেউ মুক্তা–পুঁতি বসাচ্ছেন, কেউ শেষবারের মতো রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন।
দক্ষিণ বড়দল গ্রামের প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল জানান, তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন শিল্পী ও কারিগর প্রায় ৫২ দিন ধরে কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, রং আর মুক্তা–পুঁতির কারুকাজ করেছেন। ‘প্রতিবছর প্রতিমায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করি আমরা,’ বলেন প্রকাশ মণ্ডল। ১৩টি প্রতিমায় লেগেছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা–পুঁতি, যার জন্য রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে প্রায় এক লাখ টাকার পুঁতি কেনা হয়েছে।
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কেশবলাল ঘোষ মহাশ্মশানে এবারই প্রথম দুর্গাপূজা হচ্ছে। সেখানে পাঁচ মণের বেশি পাটের আঁশে গড়া হয়েছে দুর্গাপ্রতিমা। দেবী দুর্গার অবয়ব ও পোশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাটের নান্দনিক ব্যবহার। দুই পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ, নিচে মহিষাসুর। পেছনে বড় গোলাপি পদ্ম আর আলপনার নকশা।
আয়োজক কমিটির সদস্য দেবদাস কর্মকার বলেন, সোনালি আঁশ পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য। একসময় পাট রপ্তানি করে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং পাটকে নতুনভাবে পরিচিত করতেই এ উদ্যোগ।
কলারোয়া পৌরসভার উত্তর মুরারীকাটি পালপাড়া পূজামণ্ডপে প্রায় ২৫ কেজি সাদা তিল দিয়ে সাজানো হয়েছে ১৬টি প্রতিমা। প্রচলিত সাজের বাইরের এই উপকরণ প্রতিমায় এনেছে ভিন্নতা।
এসব ব্যতিক্রমী আয়োজন স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে এবং দর্শনার্থীদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করছে বলে জানান সাতক্ষীরা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ। তাঁর আশা, প্রতিমার বৈচিত্র্যময় সাজ এবার উৎসবের আকর্ষণ বাড়াবে।
আগামীকাল শুক্রবার দুর্গাপূজা শুরু হবে বলে জানান সদরের বাসিন্দা মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায়।
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এবার জেলায় ৬১০টি মণ্ডপে পূজা হবে। পুলিশ বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করছে, আয়োজকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। ব্যতিক্রমী প্রতিমার মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।