বাংলাদেশের অর্থনীতির এক সময়ের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল সোনালি আঁশ পাট। সেই ঐতিহ্যবাহী পাটের আঁশ ব্যবহার করেই এবার তৈরি করা হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কেশবলাল ঘোষ মহাশ্মশানে প্রথমবারের মতো দুর্গাপূজায় এই অনন্য ও ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছে।

কৃষিপ্রধান বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করতে আয়োজকরা এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। পাটের তৈরি এই বিশেষ প্রতিমাটি দেখার জন্য ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতিমাটি নির্মাণে পাঁচ মণেরও বেশি পাটের আঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণত প্রতিমা তৈরিতে যেসব প্রচলিত উপকরণ ব্যবহৃত হয়, তার বাইরে গিয়ে পাট ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা পূজার আয়োজনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলার কৃষি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক পাটকে দুর্গাপূজার সাথে সম্পৃক্ত করে নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব পুনরায় জাগ্রত করাই ছিল আয়োজকদের মূল লক্ষ্য।

প্রতিমাটি দেখতে আসা দর্শনার্থী পাখি দাস বলেন, “পাট দিয়ে তৈরি প্রতিমাটি তার খুব ভালো লেগেছে। প্রতিমাটি দেখতে অনেক মানুষ আসছেন। প্রতিবছর এমন আয়োজন হলে আরও ভালো লাগবে।”

আয়োজক কমিটির সদস্য দেবদাস কর্মকার জানান, সোনালি আঁশ পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সময় পাট রপ্তানির মাধ্যমে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধরে রাখা এবং পাটকে আরও জনপ্রিয় ও পরিচিত করে তুলতেই দেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় পাটের প্রতিমা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা দীপক কুমার ঘোষ জানান, শৈশব থেকেই তিনি তাঁর বাবার সাথে এই মন্দিরে আসতেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে পূজা ও প্রার্থনা করতে ভিড় করেন। এবার প্রথমবারের মতো এখানে দুর্গাপূজার আয়োজন হওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর প্রত্যাশা, এই বিশেষ আয়োজনের কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও অনেক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে।

কেশবলাল ঘোষ মহাশ্মশানের সভাপতি গোবিন্দ সাধু বলেন, “অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় মন্দিরে অনেক ভক্তের সমাগম হয়। তাদের কাউকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না, তারা নিজেরাই আসেন। অনেকে এখানে মনোবাসনা পূরণের আশায় প্রার্থনা করেন। এবার সবার উদ্যোগে প্রথমবারের মতো দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে।”

মন্দিরের সেবায়েত বাসুদেব জানান, এখানে প্রথমবারের মতো পাটের প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে এবং এই উদ্যোগটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। প্রতি বছর যেন একইভাবে সুন্দরভাবে পাটের প্রতিমা তৈরি করা যায়, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি পূজার আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সাবেক শিক্ষক শিবপদ দাস বলেন, “কৃষিপ্রধান বাংলার ঐতিহ্য পাটকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই প্রতিমায় পাটের ব্যবহার করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, শুধুমাত্র প্রতিমাটি তৈরিতেই প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পূজার অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা হতে পারে বলে তিনি জানান।

আয়োজকদের বিশ্বাস, পাটের তৈরি দুর্গাপ্রতিমার এই অভিনব উদ্যোগ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশ পাটের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করবে। একই সাথে কৃষি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে ঐতিহ্যকে নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।