জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সাথে সংগতি রেখে পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং নতুন মজুরিকাঠামো দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। তাঁদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পোশাক শ্রমিকদের জন্য একটি ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি এবং অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘গার্মেন্ট শ্রমিকদের আসন্ন মজুরি বৃদ্ধি ও নতুন মজুরিকাঠামো কেন জরুরি?’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। উক্ত সেমিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা এসব দাবি উত্থাপন করেন। আয়োজিত এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে।
সেমিনারে উপস্থাপিত একটি লিখিত বক্তব্যে আলোকপাত করা হয় যে, ২০২৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের জন্য সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ওই বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। তবে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির তুলনায় এই নির্ধারিত মজুরি ছিল প্রায় অর্ধেক। এরপর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলেও ন্যূনতম মজুরির কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বক্তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০১৮ সালে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা ৮ হাজার টাকায় কেনা সম্ভব ছিল, ২০২৬ সালে সেই একই পরিমাণ জিনিস কিনতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হবে। কিন্তু শ্রমিকদের আয় সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। এর ফলে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বাসাভাড়ার মতো মৌলিক খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক শ্রমিককে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও তাঁদের পক্ষে পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেমিনারে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “শ্রমিক ও শিল্পের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে পারে।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে মালিকপক্ষ একমত। তবে এই বোর্ডটি ঠিক কবে গঠন করা হবে, তা সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ারের বিষয়। পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন যে, নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য মালিকপক্ষের কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন গ্রেডের মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা বলা হলেও বাস্তবে এর নিচে আরেকটি গ্রেডে ৯ হাজার ৮৭৫ টাকা দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকপক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং মজুরি বোর্ডে নিজেদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হবে।” তাঁর মতে, শিল্পের উৎপাদনশীলতার কথা বিবেচনা করেই শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি প্রদান করা প্রয়োজন।
এই সেমিনারে আরও বক্তব্য প্রদান করেন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু, সমাজতান্ত্রিক গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি আহসান হাবিব বুলবুল এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতারসহ অন্যান্যরা।