ইসলামাবাদে বেশ কয়েক দিন ধরে যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, গত রোববার তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পরিচালিত সরকারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের বিষয়ে শনিবার থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও জল্পনা চলছিল।

সারা দিন ধরে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে সম্ভাব্য জরুরি অবস্থা জারির খবর প্রচার করা হয়। সে সময় বলা হচ্ছিল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠক আহ্বান করবেন। তবে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা প্রকাশ্যে এবং আড়ালে একের পর এক বৈঠক করতে থাকেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল শেষ মুহূর্তে কোনোভাবে এই কঠিন সিদ্ধান্তটি এড়িয়ে যাওয়া। তবে এসব আলোচনার চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা তখন স্পষ্ট ছিল না। সরকার ও পিটিআইয়ের পাশাপাশি এই আলোচনায় যুক্ত হয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজল (জেইউআই-এফ)।

জেইউআই-এফ দলটির পক্ষ থেকে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। রোববার সকালে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল জানায়, মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী মাওলানা ফজলুর রহমানকে ফোন করেছেন। এতে অনেকের মনে হয়েছিল, শেষ মুহূর্তে হয়তো কোনো সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সরকারি ঘোষণা আসে যে, প্রদেশে জরুরি অবস্থা এবং গভর্নরের শাসন জারি করা হয়েছে। পরবর্তীতে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ফোন করে মাওলানাকে কেবল সিদ্ধান্তটিই জানিয়েছিলেন।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীসহ কয়েকজন সংবাদ সম্মেলনে এসে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁদের চেহারায় কিছুটা বিমর্ষ ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, সম্ভবত আগের রাতে তাঁদের ভালো ঘুম হয়নি। অন্যদিকে, পিটিআইয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক। মনে হচ্ছিল, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ঠিক কী ঘটছে, তা টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যথাযথভাবে প্রচার করছে না। পিটিআই নেতাদের বর্তমান পরিণতি কী হয়েছে, সে বিষয়েও তেমন কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার সরকার বরখাস্ত করার পক্ষে যে যুক্তিগুলো দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সন্ত্রাসবাদ অন্যতম। তবে নতুন এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রদেশে সহিংসতা কমাতে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। এর একটি প্রধান কারণ হলো, জরুরি অবস্থা জারির যুক্তি হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে সামনে আনা হলেও পিটিআই সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার প্রকৃত কারণ এটি নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এবং প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকারসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কতজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে সংবাদ খুব কম পাওয়া যাচ্ছে এবং সরকারও বিস্তারিত জানাতে আগ্রহী নয়। মনে হচ্ছে, মূলধারার ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমে পিটিআই সংক্রান্ত খবর প্রচার সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

সন্ধ্যার মধ্যেই একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয় এবং সদস্যদের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিষদের সদস্যরা গভর্নরের সঙ্গে পরিচিতিমূলক বৈঠকও করেন। তাঁদের পরিচয় ও দায়িত্বের বিবরণ বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, এই সিদ্ধান্ত নিতে ২৪ ঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় সরকার একই সঙ্গে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেছে। এর পেছনের যুক্তি বোঝা বেশ কঠিন। তবে এক আইনজীবীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গভর্নরের শাসনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, কিন্তু সংসদের অনুমোদনে জারি করা জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা নেই। কেন্দ্রীয় সরকার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আটকে থাকতে চায়নি এবং একই সঙ্গে তারা পিটিআই সরকারকেও বহাল রাখতে চায়নি। তাই দুটি ব্যবস্থাই কার্যকর করা হয়েছে। প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং নতুন পরিষদ গঠনের ধরন দেখে মনে হয়, এই ব্যবস্থা স্বল্প সময়ের জন্য নেওয়া হয়নি।

আগামী দিনগুলোতে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা হবে। কিন্তু সম্ভবত জনগণের ভোটে ক্ষমতায় না এসেও ক্ষমতা ভোগ করতে থাকার মূল্য হিসেবেই তাদের এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে হয়েছে। দল দুটি বেশ আগেই গণতন্ত্রের পথ থেকে সরে গেছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার সরকার বরখাস্ত করার পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সন্ত্রাসবাদ অন্যতম। নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রদেশে সহিংসতা কমাতে খুব বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। এর একটি কারণ হলো, জরুরি অবস্থা জারির যুক্তি হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে সামনে আনা হলেও পিটিআই সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার প্রকৃত কারণ এটি নয়।

অন্যদিকে সরকারের যুক্তির মধ্যেই বড় ধরনের স্ববিরোধিতা রয়েছে। সরকার দাবি করছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াইয়ে পিটিআই রাজনৈতিক সমর্থন জোগায়নি। অথচ সেই রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার বদলে একটি নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে বিশেষজ্ঞ ও আমলানির্ভর প্রশাসন বসানো হয়েছে। এতে করে কীভাবে জনগণের সমর্থন পাওয়া সম্ভব হবে?

আরিফা নূর পাকিস্তানের লেখক ও সাংবাদিক

ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত