পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি শাসন জারির পর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। এই অভিযানে খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শত শত নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।
গত রোববার প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং একই সাথে ওই প্রদেশের সরকার স্থগিত করেন। স্থগিত হওয়া এই প্রাদেশিক সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদি।
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, আফগানিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন এই প্রদেশে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দমনে প্রাদেশিক সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আর এই ব্যর্থতার কারণেই জরুরি শাসন জারি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পিটিআই এই যুক্তির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটির অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে সমর্থকেরা যেন ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রা করতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জরুরি শাসন জারি এবং প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার এই পদক্ষেপের ফলে ৭৪ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের সঙ্গে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে। উল্লেখ্য, জরুরি শাসন জারির এক সপ্তাহ আগে থেকেই ওই প্রদেশে ইমরান খানের সমর্থকেরা বেশ কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাঁদের মূল পরিকল্পনা ছিল ইসলামাবাদে গিয়ে ইমরান খানের মুক্তি ও চিকিৎসার দাবিতে চাপ সৃষ্টি করা।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্যকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে (আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে আগাম আটক) নেওয়া হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের কারও বিরুদ্ধে বিচারযোগ্য মামলা পাওয়া গেলে অভিযোগ গঠন করে বিচার করা হবে। অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হবে।”
তালাল চৌধুরী আরও জানান, গতকাল রোববার খাইবার পাখতুনখাওয়ার রাজধানী পেশোয়ারে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন থেকে তাঁদের আটক করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘিরে ফেলেছিল। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে শিপিং কনটেইনার বসিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
ইমরান খানের সহযোগী শওকত ইউসুফজাই পিটিআই নেতা-কর্মীদের এই গণ-ধড়পাকড়ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং আটক রাজনীতিকদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি করেছেন। এর আগে পরিকল্পিত পদযাত্রার আগেই ইমরান খানের তিন বোন এবং তাঁর কয়েক শ সমর্থককে আটক করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, দুই বছর আগে পিটিআইয়ের শেষ বড় বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ঘটেছিল। এছাড়া ২০২৩ সালে ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর সমর্থকেরা সামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, জরুরি অবস্থার সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার যেকোনো প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার রাখে। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর এখন থেকে প্রদেশের দায়িত্ব পালন করবেন গভর্নর।
গত কয়েক মাসে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সশস্ত্র হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, পিটিআই সরকার এই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও পিটিআই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত মাসে পদযাত্রার ঘোষণা দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আইনমন্ত্রী তারার দাবি করেন, সরকার পিটিআইয়ের প্রায় সব দাবি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল এবং এমনকি পদযাত্রার অনুমতিও দিতে রাজি ছিল। তবে সরকারের একটি নির্দিষ্ট শর্ত ছিল। তারারের ভাষ্যমতে, “আমরা শুধু একটি বিষয় চেয়েছিলাম। তা হলো দলটি প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতার নিন্দা করবে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে।”
তারারের দাবি, পিটিআই এই শর্তে রাজি হয়নি, যার ফলে আলোচনা প্রক্রিয়াটি ভেঙে যায়।