পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতা-কর্মীদের শুরু করা ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চের ছয় দিন পার হয়ে গেলেও তা খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বাইরে যেতে পারেনি। গত রোববার এই প্রদেশ থেকেই লংমার্চের যাত্রা শুরু করে ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত দল পিটিআই। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে কর্মসূচিটি এখন পর্যন্ত ওই প্রদেশেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
পিটিআইয়ের এই কর্মসূচির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি গতকাল শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “তাঁরা যেন পেশোয়ারের সাবি জেলা অতিক্রম করার দুঃসাহস না দেখান।” অন্যদিকে, লংমার্চ শুরুর আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, বিক্ষোভকারীদের কোনোভাবেই ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তবে পিটিআইয়ের পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখপাত্র শওকত ইউসুফজাই গতকাল জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী গতকাল জিও নিউজকে বলেছেন, “খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে কেন্দ্র সরকার তার আলোচনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।” তবে এই আলোচনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি।
পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে যে, “পিটিআইয়ের নেতা-কর্মীদের দলের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে। ইমরান খানের মুক্তিসহ সব দাবি মানতে হবে। দাবি না মানা পর্যন্ত লংমার্চ চলবে।”
উল্লেখ্য, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বর্তমানে ইমরান খানের দল পিটিআই-এর শাসন চলছে। গত রোববার এই প্রদেশ থেকে গাড়িবহর নিয়ে ইসলামাবাদ অভিমুখে যাত্রা শুরু করে দলটির নেতা-কর্মীরা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার তাদের ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং এরপর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
তবে গতকাল দেখা গেছে, লংমার্চের নেতা-কর্মীরা খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পেশোয়ারে অবস্থান করছেন এবং সেখানে বিক্ষোভ সমাবেশ করছেন। গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে পিটিআইয়ের এক্স হ্যান্ডলে একটি ভিডিও ফুটেজ শেয়ার করা হয়। সেখানে বলা হয়, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদি একটি বড় ঘোষণা দিয়েছেন এবং বিশাল লংমার্চ ইসলামাবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভিডিওতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন-এর এক প্রতিবেদনে রাত ১১টার দিকে জানানো হয়, মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে লংমার্চ চারসদ্দারের পথে রয়েছে। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “কেউ ভয় পাবেন না। চারসদ্দার হয়ে সাবির পর আমাদের অন্য জায়গায়ও যেতে হবে।” তবে আগামী রোববার সাবি পৌঁছানোর পর লংমার্চ কোন দিকে এগোবে, তা তিনি জানাননি।
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি গতকাল পিটিআই বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা সাবি এলাকা পার হওয়ার সাহস দেখাবে না। কারণ, “তারা যখনই সাবির দিকে পা বাড়ায়, তখনই তাদের পা কাঁপতে শুরু করে এবং বুক দুরুদুরু করে।”
জানা গেছে, সাবি এলাকাটি পাখতুনখাওয়া ও পাঞ্জাব প্রদেশের সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চল এবং লংমার্চের নির্ধারিত রুটে এই এলাকাটি রয়েছে। তবে শুরু থেকেই লংমার্চের রুট বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
জিও নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পিটিআই খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখপাত্র শওকত ইউসুফজাই তাদের প্রদেশে ‘অঘোষিত’ গভর্নরের শাসন চলছে বলে অভিযোগ করে সরকারের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “পিটিআইয়ের নেতা-কর্মীদের দলের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে। ইমরান খানের মুক্তিসহ সব দাবি মানতে হবে। দাবি না মানা পর্যন্ত লংমার্চ চলবে।” এছাড়া পিটিআই নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউসুফজাই জানান, সরকার ও পিটিআই-এর মধ্যে কোনো মধ্যস্থতার কথা তাঁর জানা নেই।
২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দী রয়েছেন ইমরান খান। তাঁকে অবৈধভাবে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে তাঁর মুক্তির দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছিল পিটিআই। পরবর্তীতে তারিখ পরিবর্তন করে ৪ অক্টোবর (রোববার) ধার্য করা হয়। লংমার্চ শুরুর আগে সরকারি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা করলেও কোনো সমঝোতা হয়নি।
পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফ্রাসিয়াব খটক গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পিটিআইয়ের লংমার্চ পাখতুনখাওয়া প্রদেশেই আটকে আছে। পেশোয়ারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সার্বিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে, লংমার্চের নেতা-কর্মীদের পাঞ্জাব প্রদেশে কিংবা রাজধানী ইসলামাবাদে যেতে দেওয়া হবে না। এছাড়া পাখতুনখাওয়ায় পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকারও চাপের মুখে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পিটিআই নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি প্রাদেশিক মন্ত্রীরাও অপহরণের শিকার হচ্ছেন।