সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা কারাবন্দী ইমরান খানকে একটি বিশেষ সমঝোতার পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, অতীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং বেনজির ভুট্টোর ক্ষেত্রে যে ধরনের সমঝোতা প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও ঠিক তেমনই।
গত শুক্রবার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় নেতা মাহমুদ খান আচাকজাই এই গুরুতর দাবিটি উত্থাপন করেন। তিনি এমন একটি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পাকিস্তানের ওই দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী অতীতে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন।
ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলা হয়, নওয়াজ শরিফ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতার পর ২০০০ সালে তিনি পাকিস্তান ত্যাগ করেন। সৌদি আরব ও লেবাননের শীর্ষ নেতাদের মধ্যস্থতায় সেই সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছিল।
অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফারুক লেঘারি বেনজির ভুট্টোর সরকারকে বরখাস্ত করেন। এর পরের বছর, ১৯৯৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পরাজিত হয়। ১৯৯৯ সালে লাহোর হাইকোর্টে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার আগেই বেনজির দেশ ছাড়েন এবং দুবাই ও লন্ডনে নির্বাসিত জীবন শুরু করেন। যদিও ২০০১ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সেই সাজা বাতিল করে পুনরায় বিচারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বেনজির ভুট্টো যখন নির্বাসনে ছিলেন, তখন তাঁর স্বামী আসিফ আলী জারদারি দুর্নীতির মামলায় বন্দী ছিলেন এবং আট বছর কারাভোগের পর ২০০৪ সালে জামিনে মুক্তি পান।
পেশোয়ার হাইকোর্টে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খান আচাকজাই বলেন, “এখন সরকারে থাকা পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল।”
এই সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খানের সঙ্গে তেহরিক-ই-তাহাফুজ-আইন-ই-পাকিস্তানের (টিটিএপি) নেতারা উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে সরদার আখতার মেঙ্গল ও আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস অন্যতম।
সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ খান আচাকজাই জানান, তাঁরা বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং খুব শীঘ্রই একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হবে। তিনি আরও জানান, “পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।”
কারাবন্দী ইমরান খানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মাহমুদ খান আচাকজাই বলেন, “একজন বন্দীর সঙ্গে কাউকে দেখা করতে দেওয়া হয় না—বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না।”
সংসদকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতাবান না করা পর্যন্ত দেশের কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য আইনপ্রণেতাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাহমুদ খান। মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান কোথায়, তা প্রকাশ করার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান এবং বলেন, এ বিষয়ে জানার সাংবিধানিক অধিকার তাঁদের রয়েছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি গতকাল ভিন্ন সুর শোনালে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “একটি দলের প্রধান খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর হতে না পেরে ‘ভীষণ ক্ষুব্ধ’ হয়েছেন।” তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করেননি।
লাহোরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মহসিন নাকভি বলেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোনো পদ না পাওয়া এবং গভর্নর হতে না পারায় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মহসিন নাকভি সম্ভবত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজল (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানকে ইঙ্গিত করেছেন, যিনি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারি করায় কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
নাম প্রকাশ না করে ওই রাজনীতিবিদের সমালোচনা করে মহসিন নাকভি বলেন, তিনি কয়েক দশক ধরে তাঁর রাজনৈতিক জীবন এগিয়ে নিতে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, যেসব রাজনীতিবিদ এখন বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচনা করছেন, একসময় তাঁরাই এই ব্যবস্থা থেকে সুবিধা নিয়েছেন। তাই এখন এসব সমালোচনার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করা হয়েছে। সেখানে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের শাসন চলছিল। প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমিয়ে দিয়েছে’—এমন অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় সরকার এই পদক্ষেপ নেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন মাওলানা ফজলুর রহমান, মাহমুদ খান আচাকজাই এবং রাজা নাসির আব্বাসের মতো বিরোধী দলীয় নেতারা।