মাদ্রিদে গতকাল রাতে আতলেতিকো মাদ্রিদের মুখোমুখি হয়ে ২–০ গোলে পরাজিত হওয়ার পর নিজেদের ক্ষোভ ধরে রাখতে পারেননি লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার।
ইউনাইটেডের ফুটবল পরিচালক জেসন উইলকসের সমালোচনা করে মার্তিনেজ দাবি করেন, গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময়ে স্কোয়াডকে যথেষ্ট শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। সহজ কথায়, বর্তমান দলের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না তিনি। তবে মার্তিনেজের এই প্রকাশ্য সমালোচনার পরিণাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ওয়েইন রুনি।
মার্তিনেজের এই মন্তব্যের ফলে ইউনাইটেডের ‘ড্রেসিংরুমের ঐক্য চূর্ণবিচূর্ণ হবে’ বলে আশঙ্কা করেছেন ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা রুনি।
ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের নীতিনির্ধারকদের প্রতি মার্তিনেজ এমন এক সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন যখন মাঠের লড়াইয়ে দল চরম ধুঁকছে। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচে জয়শূন্য ইউনাইটেড। গত ১০ সেপ্টেম্বর চ্যাম্পিয়নস লিগে আজারবাইজানের ছোট দল সাবাহর বিপক্ষে তারা শেষবারের মতো জয়লাভ করেছিল। চলতি মৌসুমে খেলা ৯টি ম্যাচের মধ্যে অন্য জয়টি এসেছে প্রিমিয়ার লিগে newly promoted ক্লাব ইপসউইচ টাউনের বিপক্ষে, যেখানে পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেছিল তারা।
গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে গত তিন বছরের মধ্যে এবারই প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সুযোগ পায় ইউনাইটেড। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ মাইকেল ক্যারিকের অধীনে গত মৌসুমে লিগের শেষ ১৭টি ম্যাচের মধ্যে ১২টিতে জয়লাভ করে ইউরোপের এই শীর্ষ টুর্নামেন্টের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। তবে চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই ছন্দ হারিয়েছে ইউনাইটেড।
মাদ্রিদে গতকাল রাতের লড়াইয়ে সেই ব্যর্থতারই প্রতিফলন দেখা গেছে। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় আতলেতিকোর বিপক্ষে পাঁচবারের দেখায় তিনবার হেরেছে ইউনাইটেড এবং একবারও জয়লাভ করতে পারেনি। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ থেকে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়া মাইকেল ক্যারিকের ওপর চাপ এখন অনেক বেশি।
তবে মার্তিনেজ এই ব্যর্থতার জন্য ক্যারিককে দায়ী মনে করেন না। তাঁর মতে, গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলে পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ না করার জন্য কোচ নয়, বরং ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। ইংল্যান্ডের বড় ছয়টি প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের তুলনায় ইউনাইটেডের নতুন খেলোয়াড় কেনায় ব্যয় করা ১৫ কোটি পাউন্ডের অঙ্কটি বেশ কম।
মাদ্রিদে হারের পর আমাজন প্রাইমকে মার্তিনেজ বলেন, ‘খুব খুব বাজে। নিজেকে সংযত রাখতে হয়। তবে এ পরিস্থিতিই বর্তমান সময়ে ক্লাবের প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন। গত মৌসুমে আমরা দারুণ করেছিলাম। এখন ওপর মহল থেকে আমাদের আশা আরও বেশি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আরও বেশি খেলোয়াড় চাই। কারণ, অন্য দলগুলো অনেক খেলোয়াড় দলে ভেড়াচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি আরও (বিনিয়োগ) আশা করি। শতভাগ। আমাদের টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের (জেসন উইলকস) কাছে আরও বেশি কিছু চাই। সত্যি বলতে, খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের অনেক কিছু করার আছে, তবে এমন একটা শক্তিশালী স্কোয়াড গঠন করাও জরুরি, যা এ ধরনের রাতের জন্য প্রস্তুত থাকে।’
ক্যারিকের ওপর চাপের বিষয়ে সরাসরি আঙুল তোলেন ক্লাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি। মার্তিনেজ বলেন, ‘বারবার ম্যানেজার বদলাতে পারেন না। তাহলে অন্য দিকগুলোর কী হবে? (ওপরে তাকিয়ে) আমি আর বেশি কিছু বলতে পারছি না। কোচের ওপর দোষ চাপানো বা খেলোয়াড়দের দোষ দেওয়া সহজ, তবে আমাদের অন্য দিকগুলোও দেখতে হবে (ওপরে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে)...এখানে এসে এমন ফল বিরক্তিকর ও হতাশাজনক। দল দারুণ ফল পাওয়ার চেষ্টা করেছে, সেটা আমি দেখিনি।’
মার্তিনেজের এই মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কোচ মাইকেল ক্যারিক উত্তর দেন, ‘আমি যেহেতু এটি দেখিনি, তাই এই মুহূর্তে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আমরা সবাই ক্লাবের জন্য ভাবি এবং একেকজন একেকভাবে প্রকাশ করি।’
মাদ্রিদে ম্যাচটি দেখতে গিয়েছিলেন ইউনাইটেডের দুই সাবেক তারকা ওয়েইন রুনি ও অ্যাশলে ইয়াং। আমাজন প্রাইমে মার্তিনেজের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা দুজনেই জানান, এই ডিফেন্ডার বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন এবং এর ফলে ড্রেসিংরুমের ভেতরে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
রুনির ভাষায়, ‘এ ধরনের মন্তব্য ড্রেসিংরুমের ঐক্য চূর্ণবিচূর্ণ হবে।’ এই প্রসঙ্গে রুনি ২০১০ সালের নিজের একটি উদাহরণের কথা উল্লেখ করেন, যখন তিনি প্রকাশ্যে ক্লাবের সমালোচনা করেছিলেন এবং তৎকালীন কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। রুনি জানান, সেটি তাঁর একটি ভুল ছিল এবং তিনি সে জন্য ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
মার্তিনেজের মন্তব্যের বিষয়ে রুনি আরও বলেন, ‘এটা তাঁর সতীর্থদের প্রতি অসম্মানজনক। সে বলতে চাইছে যে তাঁর সতীর্থরা যথেষ্ট ভালো নয়। এ কথা বলার অধিকার একমাত্র ব্রুনোর (অধিনায়ক)। বন্ধ দরজার আড়ালে এমনটা হতেই পারে। (মার্তিনেজ) খেলোয়াড়দের হয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পদ্ধতিটা ভুল।’
অন্যদিকে, মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে ম্যাচে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়েরার মনে করেন, মাইকেল ক্যারিকের সঙ্গে একপ্রকার অবিচার করা হয়েছে।