সম্প্রতি ফুটবল বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি রায় সামনে এসেছে, যা সবকিছু তছনছ করে দেওয়ার মতো। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়মাবলি লঙ্ঘনের দায়ে ম্যানচেস্টার সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই রায়ের প্রভাব এতটাই মারাত্মক হতে পারে যে, ইংলিশ ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তর থেকে তাদের নাম চিরতরে মুছে যেতে পারে। ফলে গত কয়েক দিন ধরে চরম দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে কাটাছেঁড়া করছেন সিটির সমর্থকেরা।

এমন এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই আজ চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির মুখোমুখি হচ্ছে সিটি। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভাঙার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এটাই সিটির প্রথম ইউরোপীয় ম্যাচ। মাঠের ভেতরের লড়াইয়ে তারা এখন বেশ শক্তিশালী; যার প্রমাণ মিলল গত রোববার লিভারপুলকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করার ঘটনায়। টানা ছয় ম্যাচ জিতে লিগ টেবিলের শীর্ষে অবস্থান করছে তারা। তবে মাঠের বাইরের হিসাবগুলো অত্যন্ত জটিল, যেখানে এই জয়গুলোর প্রকৃত মূল্য কতটুকু হবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

প্রিমিয়ার লিগের স্বাধীন কমিশনের দেওয়া রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আমিরাতের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে ‘ভুয়া’ বাণিজ্যিক চুক্তি করে সিটি তাদের আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছে এবং খরচ কমিয়ে দেখিয়েছে। এই অংকের পরিমাণ ৯০ কোটি পাউন্ডের বেশি, যা ডলারে রূপান্তর করলে দাঁড়ায় ১২০ কোটি।

এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত শাস্তি নির্ধারিত হয়নি। তবে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা, পয়েন্ট কর্তন, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে। আপিলের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত পুরো লিগ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদি রায় সিটির বিপক্ষে চূড়ান্ত হয়, তবে গত ১৫ বছরে তাদের জেতা সব ট্রফির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

এই ১৫ বছরের সাফল্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে, যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ধনকুবের শেখ মনসুর ক্লাবটি কিনে নেন। এরপরের ঘটনাপ্রবাহ ছিল রূপকথার মতো। একের পর এক শিরোপা ক্লাবের শো-কেসে জমা হতে থাকে। ২০২৩ সালে ইস্তাম্বুলে ইন্টার মিলানকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় এবং প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপ জিতে ওই মৌসুমে ট্রেবল জয় করা ছিল তাদের সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখর।

সিটির এই সাফল্যের দৌড়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল পিএসজিও। তবে যে পিএসজি এক সময় সিটির পথ অনুসরণ করতে চাইত, তারাই এখন ইউরোপের ফুটবল সম্রাট। টানা দুই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর তাদের লক্ষ্য এখন টানা তৃতীয় শিরোপা জয়। ফ্রান্সের ঘরোয়া ফুটবলে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।

অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার সিটির সামনে এখন অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। তারা কি প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকবে? টিকে থাকলেও কত পয়েন্ট নিয়ে লড়াই করবে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আগামী মৌসুমে তারা কি চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে পারবে? বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী মৌসুমে এই প্রতিযোগিতায় ফেরার একমাত্র পথ হতে পারে এবারের শিরোপা জয়। তাই আজ তাদের সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যে দল টানা তৃতীয়বারের মতো ইউরোপসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের থামিয়ে দেওয়াই এখন সিটির লক্ষ্য।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে উয়েফার ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে নিয়মের শুরুর দিকে সিটি এবং পিএসজি উভয় ক্লাবই আইনি জটিলতায় জড়িয়েছিল এবং উয়েফার সঙ্গে নিষ্পত্তি চুক্তিতে গিয়েছিল। তবে এরপর থেকে দুই ক্লাবের পথ আলাদা হয়ে যায়। পিএসজি পরবর্তীতে এই ধরনের ঝামেলা থেকে দূরে থাকে। এর পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছেন ক্লাবের সভাপতি নাসের আল খেলাইফি। তিনি উয়েফার নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর সংগঠন ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবস (ইএফসি) সংস্থার চেয়ারম্যান।

গত মাসে কোপেনহেগেনে ইএফসির এক বৈঠকে সিটির প্রধান নির্বাহী ফেরান সরিয়ানোর পাশে দাঁড়িয়েছেন খেলাইফি। তিনি বলেছেন, “তাঁর ক্যারিয়ার চমৎকার। ম্যানচেস্টার সিটি অনেক ইতিবাচক কাজ করেছে। তবে বিচার করার অবস্থানে আমি নেই।” তিনি আরও যোগ করেছেন, “আমার মনে হয়, আপিল করার অধিকার তাদের আছে। তাই এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।”

খেলাইফির এই কথাগুলো আপাতদৃষ্টিতে ভদ্রতাপূর্ণ মনে হলেও এর গভীরে ভিন্ন অর্থ থাকতে পারে। সিটির এই সংকট যদি তাদের ইউরোপীয় মঞ্চ থেকে কয়েক বছরের জন্য সরিয়ে দেয়, তবে তা পিএসজির জন্য বড় জয় হবে। শুধু মাঠের লড়াইয়েই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমিরাত ও কাতারের মধ্যকার নীরব লড়াইয়ে প্রভাব ও ভাবমূর্তির দিক থেকে কাতার তখন এগিয়ে যাবে।

আজ রাতের লড়াইটি ৯০ মিনিটেই শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু নেপথ্যে চলতে থাকা এই প্রভাব ও ক্ষমতার লড়াই কবে শেষ হবে, তা এখনো অজানা।