ম্যানচেস্টার সিটির আর্থিক অনিয়মের ঘটনা এখন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়মাবলি লঙ্ঘনের অভিযোগে ক্লাবটি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম মালিকপক্ষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সেই মন্তব্যই জন্ম দিয়েছে তীব্র বিতর্কের। বিরোধী দলগুলো এখন প্রশ্ন তুলছে, আবুধাবিভিত্তিক এই মালিকপক্ষের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঠিক কতটা ঘনিষ্ঠ।
এই ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মুখে পড়ে অবশেষে ম্যানচেস্টার সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর অতীতের সব বৈঠকের বিবরণ প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন বার্নহ্যাম। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই বৈঠকগুলোর কোনোটিই সাম্প্রতিক সময়ের নয়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য বৈঠক হয়েছিল মাত্র একটি, যা ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তদন্তে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর ধরে আর্থিক নিয়ম ভেঙেছে ম্যানচেস্টার সিটি। প্রিমিয়ার লিগের গঠিত একটি স্বাধীন কমিশনের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ভুয়া চুক্তি করার মাধ্যমে গোপনে ৮৩ কোটি পাউন্ডের বেশি অর্থ ক্লাবের ফুটবল কার্যক্রমে প্রবেশ করিয়েছে সিটি। গত মাসে ঘোষিত রায়ে প্রিমিয়ার লিগের তদন্তে অসহযোগিতা সংক্রান্ত একটি অভিযোগ ছাড়া বাকি সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ক্লাবটি। তবে এখনো চূড়ান্ত শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি এবং ক্লাবটি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। শুরু থেকেই সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে ম্যানচেস্টার সিটি।
রায় ঘোষণার পর বার্নহ্যাম যখন বিতর্কের মুখে পড়েন, তখন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সিটির মালিকেরা ক্লাব বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি ‘সত্যিই উদ্বিগ্ন’ হবেন।”
বার্নহ্যামের এই মন্তব্যে প্রিমিয়ার লিগের বেশ কিছু ক্লাব বিস্মিত হয়েছে। বিবিসি স্পোর্টসকে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বার্নহ্যামের এমন অবস্থান দেখে ক্লাবগুলো এতটাই ‘হতবাক’ হয়েছিল যে, আপিল প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বাডেনক প্রধানমন্ত্রী ও ম্যানচেস্টার সিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সব বৈঠকের তথ্য প্রকাশের দাবি জানান। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই সাড়া দিয়েছেন বার্নহ্যাম।
‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা আমার বৈঠকগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করতে বলেছেন। আমি আনন্দের সঙ্গেই তা করতে রাজি এবং সেটাই করব।”
বার্নহ্যাম আরও ব্যাখ্যা করেন, “গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে আগের দায়িত্ব পালনের সময় তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যা কিছু করেছি, সবই পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করব। আসলে আমার বৈঠকগুলোর কোনোটিই সাম্প্রতিক সময়ের নয়। উল্লেখযোগ্য বৈঠক হয়েছিল মাত্র একটি, সেটি ২০২১ সালে।”
উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র ছিলেন বার্নহ্যাম। তাঁর মেয়রত্কালে ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল মাঠে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। একই সময়ে তিনি ম্যানচেস্টারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছিলেন, যদিও এই নীতি তিনি মেয়র হওয়ার আগেই শহর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছিল।
তবে সিটির মালিকপক্ষকে নিয়ে তাঁর আগের মন্তব্য ভুল ছিল বলে মনে করেন না বার্নহ্যাম। তাঁর যুক্তি হলো, ফুটবলের আর্থিক অনিয়ম এবং ম্যানচেস্টারে বিদেশি বিনিয়োগ—এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
পডকাস্টে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না, আমি ভুল কিছু বলেছি। তবে এটুকু বলব, তখন সব বিষয় আমার মাথায় ছিল না। আমার মনোযোগ ছিল লেবার পার্টির সম্মেলনের দিকে। সেই সম্মেলন নিয়েই বিভিন্ন সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলাম।”
এরপর তিনি এই দুই বিষয়কে এক করে দেখার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, “আমি বিষয় দুটিকে এক করে দেখিনি। প্রশ্নগুলোতেই বরং দুটি বিষয়কে একসঙ্গে আনা হয়েছিল। আমি বলব, এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। ফুটবলের বিষয় আর বিনিয়োগের বিষয় এক নয়। অনেকে দুটিকে মিলিয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আমার মতে, সেটা করা উচিত নয়।”
তা সত্ত্বেও স্বাধীন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগের গুরুত্ব অস্বীকার করেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ফুটবলের বিষয়গুলোয় স্বাধীন কমিশনের অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে, তা গুরুতর। সাক্ষাৎকারেও আমি সেটাই বলেছিলাম।”
ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এই বিচারপ্রক্রিয়া প্রিমিয়ার লিগের প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালে টানা ৪২ দিন শুনানি করেছে স্বাধীন কমিশন এবং সেই শুনানির ভিত্তিতেই গত মাসে রায় দেওয়া হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে সিটির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর ভূমিকা নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ক্লাবটির “বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং তাঁদের কেউ কেউ জেনেশুনে অসত্য ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাক্ষ্য দিয়েছেন।” বর্তমানে সিটির আপিলের বিষয়টি শুনবে পৃথক একটি স্বাধীন আপিল বোর্ড।
এদিকে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথম ম্যাচে গতকাল রোববার অ্যানফিল্ডে লিভারপুলের মুখোমুখি হয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি এবং মাঠের লড়াইয়ে ৩-০ গোলে জয়লাভ করেছে তারা।