আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে শাস্তির খাঁচায় বন্দি হয়েও মাঠের লড়াইয়ে দাপট দেখাল ম্যানচেস্টার সিটি। স্বাগতিক লিভারপুলকে তাদের নিজেদের মাঠ অ্যানফিল্ডে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে এনজো মারেসকার শিষ্যরা। এই জয়ের ফলে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ছয়টি ম্যাচে ছয়টিতেই জয় পেল সিটি, যা তাদের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তেজনার পারদ ছিল তুঙ্গে। লিভারপুল সমর্থকেরা বিশাল বিশাল ব্যানারে 'চিট' বা 'প্রতারক' লিখে সিটি দলের আগমনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। আর্থিক অনিয়মে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর প্রথম ম্যাচটি খেলতে নেমেছিল সিটি, যার ফলে তাদের ওপর ছিল প্রচণ্ড মানসিক চাপ। তবে মাঠের লড়াইয়ে সেই চাপ উল্টো লিভারপুলের ওপরই চেপে বসে।

ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ৬২ মিনিটে, যখন দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় লিভারপুলের রায়ার্ন গ্র্যাভেনবার্চকে। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া লিভারপুলকে চাপে ফেলে এর মাত্র ৩ মিনিট পরেই প্রথম গোলের দেখা পায় সিটি। আর্লিং হলান্ড নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে নেন। এরপর ৬৮ মিনিটে জেরেমি ডোকু এবং ৭৮ মিনিটে রায়ান শেরকি আরও দুটি গোল করে সিটির জয় নিশ্চিত করেন।

এই জয়ের ফলে আর্সেনালের সঙ্গে পয়েন্ট ব্যবধান ৩ পয়েন্টে ধরে রেখেছে সিটি। তবে মাঠের এই সাফল্যের পাশাপাশি ক্লাবের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে আপিলের ফলাফলের ওপর। একটি স্বাধীন কমিশনের তদন্তে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সিটি এবং তাদের আমিরাতি মালিকপক্ষ ভুয়া চুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে আয় বাড়িয়ে এবং খরচ কমিয়ে দেখিয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ১২০ কোটি ডলারেরও বেশি।

এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো শাস্তির ঘোষণা আসেনি। তবে আপিলে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না পারলে বড় অঙ্কের পয়েন্ট কাটা কিংবা প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে যে, সিটির অর্জিত অতীত শিরোপাও কেড়ে নেওয়া হতে পারে। কারণ প্রিমিয়ার লিগের আইন লঙ্ঘনের ওই সময়েই তিনটি লিগ শিরোপাসহ বেশ কিছু ট্রফি জিতেছিল তারা। প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর দাবি, সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলার সোনালি যুগের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই অবৈধ খরচের ওপর ভর করেই। গত মৌসুম শেষে গার্দিওলা সিটির দায়িত্ব ছেড়েছেন।

সিটির এই অনিয়মে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লিভারপুল। গত ১২ বছরে তিনবার তারা সিটির পেছনে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেছে। ম্যাচের আগে বার্তা সংস্থা এএফপিকে কথা বলে ২৩ বছর বয়সী লিভারপুল সমর্থক মার্টিন রাইলি, ‘এমন অনেক স্মৃতি ও মুহূর্ত রয়েছে যেগুলো আমরা আর কখনো ফিরে পাব না। ওদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তিই হওয়া উচিত।’

সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে পুলিশি পাহারায় অ্যানফিল্ডে পৌঁছায় সিটির টিম বাস। ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচের মতো বোতল ছোঁড়ার ঘটনা এবার ঘটেনি। তবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অলরেড সমর্থকেরা সফরকারীদের ‘প্রতারক’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। স্টেডিয়ামের বাইরে সিটির আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ফ্ল্যাগ ও স্কার্ফ বিক্রি হতে দেখা যায়। ঐতিহাসিক 'কপ' গ্যালারিতে একটি ব্যানারে লেখা ছিল—‘একটি প্রজন্মের সব সমর্থকদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেপ গার্দিওলার সিটি এবং ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুলের লড়াই ছিল প্রিমিয়ার লিগের প্রধান আকর্ষণ। পুরো বিশ্বের নজর থাকলেও মাঠের খেলায় সেই উত্তাপ দেখাতে পারেনি লিভারপুল। চোটের কারণে দমিনিক সোবোসলাই, অ্যালেক্সান্দার ইসাক ও কোডি গাকপোকে পাননি কোচ আন্দোনি ইরাওলা। অলরেডদের ডাগআউটে বসার পর স্প্যানিশ এই কোচের এটিই প্রথম হার।

দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল স্বাগতিকরা। তবে লুইস কুমাসের প্রচেষ্টা রুখে দেন সিটির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা। এরপর গ্রাভেনবার্চের লাল কার্ডের পর পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় সিটি। জেরেমি ডোকুর শটে দিক পরিবর্তন করে বলটি হলান্ডের পায়ে যায় এবং নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারটি গোল করেন। এরপর ডি-বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো শটে গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন বেলজিয়ান উইঙ্গার ডোকু। সবশেষে ইয়োস্কো গাভার্দিওলের সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে আলিসন বেকারকে পরাস্ত করে ৩-০ গোলের জয় নিশ্চিত করেন শেরকি।