সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আফসারের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে খেলতে গিয়ে। অন্যদিকে, গত এপ্রিলে নাইজেরিয়ান সাবেক ফুটবলার মাইকেল এনেরামোও একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়ে মাঠে লুটিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নাইজেরিয়া ফুটবল ফেডারেশন নিশ্চিত করে যে, তাঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে যে, খেলাধুলা বা ব্যায়ামের সময় হঠাৎ এমন বিপদ কেন ঘটে? ব্যায়াম কি হৃদ্যন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ? নাকি ব্যায়ামের ধরন, এর তীব্রতা এবং ব্যক্তির শারীরিক প্রস্তুতির ওপরই এই ঝুঁকি নির্ভর করে?

শারীরিক ব্যায়াম শুরু করলে শরীরের পেশিগুলোর অক্সিজেনের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে হৃদ্‌যন্ত্রকে দ্রুত গতিতে এবং অধিক পরিমাণে রক্ত পাম্প করতে হয়। এর ফলে হৃৎস্পন্দনের গতি ও রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর কাজের চাপ বাড়িয়ে দেয়। একটি সুস্থ শরীর সাধারণত এই পরিবর্তনের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। তবে যদি কারও ধমনি বা করোনারি আর্টারিতে আগে থেকেই প্লাক জমে সরু হয়ে থাকে, তবে হঠাৎ তীব্র শারীরিক পরিশ্রম হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে প্লাক ফেটে গিয়ে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধার মতো জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর এই রক্ত জমাটের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলেই ঘটে হার্ট অ্যাটাক।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এক হাজার দুই শর বেশি হার্ট অ্যাটাকের রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের আগের এক ঘণ্টায় ভারী শারীরিক পরিশ্রম করলে সাময়িকভাবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে যারা নিয়মিত ভারী শারীরিক পরিশ্রমে অভ্যস্ত, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল।

ব্যায়ামের ক্ষেত্রে অভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর ধীরে ধীরে উচ্চমাত্রার পরিশ্রমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় এবং কার্ডিওরেসপিরেটরি ফিটনেস অর্থাৎ হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় এটি প্রমাণিত যে, যারা নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ ভারী পরিশ্রমের পর হার্ট অ্যাটাকের অতিরিক্ত ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

বিপরীত দিকে, দীর্ঘকাল অলস জীবনযাপন করা কোনো ব্যক্তি যদি হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড জোরে দৌড়ানো, ভারী ওজন তোলা বা অত্যন্ত কঠিন ব্যায়াম শুরু করেন, তবে শরীরের ওপর আকস্মিক চাপ পড়ে। এ ধরনের হঠাৎ তীব্র পরিশ্রম সাময়িকভাবে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা আগে থেকে এই ধরনের পরিশ্রমে অভ্যস্ত নন অথবা যাদের হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা অজানা অবস্থায় রয়ে গেছে, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ঠিক এই কারণেই ব্যায়ামের ক্ষেত্রে ‘আজ থেকেই সব বদলে ফেলব’ ধরনের তাড়াহুড়ো পরিকল্পনার চেয়ে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করা অনেক বেশি নিরাপদ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও পরামর্শ দেয় যে, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের উচিত কম মাত্রার ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা এবং শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় ও ব্যায়ামের তীব্রতা বাড়ানো।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এটি কি শুধু জিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? উত্তর হলো না। জিমে ভারী ওজন তোলার পাশাপাশি অন্য ধরনের তীব্র শারীরিক পরিশ্রমেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যেমন—দীর্ঘদিন খেলাধুলা না করে হঠাৎ ফুটবল ম্যাচে নেমে পড়া, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই দীর্ঘ দৌড়, পাহাড়ে ওঠা, ভারী জিনিস তোলা কিংবা হঠাৎ খুব দ্রুত সাইক্লিং শুরু করা। এমনকি নিয়মিত ব্যায়াম না করা কোনো ব্যক্তি যদি একদিন প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন, সেখানেও হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।

যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ আছে বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ব্যায়ামের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যারা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা জরুরি।

তাই কঠিন বা উচ্চমাত্রার ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়। বিশেষ করে মধ্যবয়সের পর কেউ যদি দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করে থাকেন এবং হঠাৎ উচ্চমাত্রার ব্যায়াম শুরু করতে চান, তবে আগে নিজের শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ব্যায়াম শুরুর আগে কিছুটা সময় নিয়ে শরীরকে প্রস্তুত করা বা ওয়ার্ম-আপ করা ভালো। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা সহজ মুভমেন্টের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাঁদের ভারী ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।