সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ল্যাপটপ, কম্পিউটার কিংবা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে বর্তমানে অনেকেরই ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ডিজিটাল যুগের এই সমস্যা এখন কমবেশি সবারই নিত্যসঙ্গী। অফিসের দাপ্তরিক কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, পড়াশোনা কিংবা অবসর সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস দেখা—সবকিছুতেই আমরা ডিজিটাল স্ক্রিনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।

তবে একটানা মাথা নিচু করে কাজ করার ফলে আমাদের ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা যখন সোজা হয়ে তাকাই, তখন আমাদের ঘাড়ের ওপর প্রায় ১২ পাউন্ড বা সাড়ে পাঁচ কেজির মতো চাপ থাকে। আর যখনই আমরা স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ি, এই চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।

পাশাপাশি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের হাড় ও জোড়ার নমনীয়তা কমে যাওয়াও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। তবে আশার কথা হলো, সামান্য সচেতনতা এবং কিছু সহজ ব্যায়ামের মাধ্যমে এই ঘাড়ের ব্যথা ও টান থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের মেরুদণ্ড আসলে সবসময় একটু নড়াচড়ার মধ্যে থাকতে চায়। একটানা একইভাবে স্থির থাকার ফলে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ অনেক বেশি পড়ে।

আপনার ঘাড়ের ব্যথা এবং ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করবে এমন ৫টি সহজ ব্যায়াম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

১. মাথা ঘোরানো বা হেড টার্নস
ঘাড়ের জড়তা কাটাতে এবং নমনীয়তা ফিরিয়ে আনতে এই ব্যায়ামটি অত্যন্ত কার্যকরী। যারা নিয়মিত ঘাড়ের ব্যথায় ভোগেন, তারা এটি করতে পারেন।
কীভাবে করবেন: আরাম করে সোজা হয়ে বসুন অথবা পিঠের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে পড়ুন। এবার আপনার মাথাটি ধীরে ধীরে যতদূর সম্ভব ডান দিকে ঘোরান। এই অবস্থায় ২ সেকেন্ডের মতো ধরে রাখুন। এতে ঘাড়ের বিপরীত পাশে মৃদু টান অনুভব করবেন। এরপর মাথা আবার মাঝখানে ফিরিয়ে এনে বাম দিকেও একইভাবে ঘুরিয়ে নিন। দুই পাশেই ২ থেকে ৩ বার করে এই ব্যায়ামটি করতে পারেন। সারাদিনে যখনই মনে হবে ঘাড় শক্ত হয়ে আসছে, তখনই এটি করা সম্ভব।

২. সঠিক অঙ্গভঙ্গি বজায় রাখা
আমাদের ঘাড় সব দিকে নড়াচড়া করার উপযোগী করেই তৈরি। তাই একে একটানা কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে আটকে রাখা যাবে না।
করণীয়: কাজের ফাঁকে নিয়ম করে ঘাড় ও মাথা চারদিকে হালকাভাবে নড়াচড়া করান। একটানা অনেকক্ষণ ঘাড় একদিকে ঝুঁকিয়ে বা মাথা কাঁধের সাথে গুঁজে রাখবেন না। লক্ষ্য রাখবেন, যেন আপনার ঘাড় মেরুদণ্ডের সঙ্গে সোজা থাকে এবং কাঁধ দুটো থাকে একদম রিল্যাক্সড। আপনি অফিসে কম্পিউটারের সামনে কাজ করুন, টিভিতে কোনো অনুষ্ঠান দেখুন কিংবা গাড়ি ড্রাইভ করুন—বসার এই ভঙ্গিটি সবসময় খেয়াল রাখা জরুরি।

৩. সামনের দিকে ঝুলে থাকা চিবুক ঠিক করা
ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনিটর বা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে অনেকেরই একটি বদভ্যাস তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ‘পোকিং চিন’। এর ফলে মাথাটি ঘাড়ের ওপর সোজা না থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে।
কীভাবে ঠিক করবেন: আপনার ঘাড়কে উপরের দিকে একটু লম্বা করুন এবং চিবুকটা সামান্য পেছনের দিকে টেনে আনুন। (মনে করুন, চিবুকের নিচে একটি নরম ফল বা পিচফল ধরে রেখেছেন, যা চ্যাপ্টা করে ফেলা যাবে না) । আপনার কলারবোন বা গলার নিচের হাড় দুটো প্রশস্ত রাখুন এবং কাঁধের পেছনের অংশ সামান্য পেছনের দিকে ও নিচে নামিয়ে আনুন। এর সঙ্গে পেটের পেশিগুলো সামান্য ভেতরে টেনে রাখুন যাতে পিঠের নিচের স্বাভাবিক বক্রতা বজায় থাকে।

৪. নেক ফ্লেক্সর বা ঘাড়ের সামনের পেশির শক্তি বাড়ানো
যেহেতু আমরা দিনের অনেকটা সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, তাই ঘাড়ের সামনের দিকের পেশি বা 'নেক ফ্লেক্সর'-এর সক্ষমতা বাড়ানো বেশ উপকারী।
কীভাবে করবেন: প্রথমে হাঁটু ভেঙে পিঠের ওপর (মেঝেতে বা বিছানায়) শুয়ে পড়ুন। আপনার পা দুটো সমান্তরালভাবে থাকবে। এবার চিবুকটি বুকের দিকে একটু নামিয়ে আনুন এবং মাথাটি বিছানা বা মেঝে থেকে সামান্য (প্রায় এক ইঞ্চি পরিমাণ) উপরে তুলুন। শুরুতে এই অবস্থায় মাত্র কয়েক সেকেন্ড থাকার চেষ্টা করুন। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেলে সময়টা বাড়িয়ে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত নিতে পারেন।

৫. ঘাড়ের গভীর স্তরের পেশিগুলোর (ডিপ নেক ফ্লেক্সর) ব্যায়াম
কীভাবে করবেন: এমন একটি চেয়ারে বসুন যার হেডরেস্ট বা মাথার পেছনে ঠেস দেওয়ার জায়গা আছে। সোজা সামনে তাকিয়ে আপনার মাথাটি পেছনের হেডরেস্টের দিকে হালকাভাবে চাপ দিন। এরপর চিবুকটি নিচের দিকে বুকের কাছে নামিয়ে আনুন। এই অবস্থায় অল্প কিছুক্ষণ থেকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যান। আপনি চাইলে আরও ভালো ফল পেতে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডও (ব্যায়ামের কাজে ব্যবহৃত স্থিতিস্থাপক বা ইলাস্টিক ব্যান্ড) ব্যবহার করতে পারেন।

এই সাধারণ ব্যায়ামগুলোর পাশাপাশি কাজের ফাঁকে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া, একটানা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থাকা এবং সঠিক ভঙ্গিতে বসা আপনার ঘাড়ের ব্যথা দূর করতে বেশ ভালো কাজ করবে। তবে আপনার ঘাড়ের ব্যথা যদি খুব বেশি হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অবশ্যই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: বিবিসি