ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জন্য নিয়মিত ও পরিকল্পিত ব্যায়ামের উপকারিতা নিয়ে একের পর এক গবেষণায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক ব্যায়াম কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিৎসার সামগ্রিক ফল উন্নত করা সম্ভব এবং ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকিও কমিয়ে আনা যায়। তবে এই প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও রোগীদের জন্য ব্যায়ামের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত।
পিটসবার্গে নিজের বাড়ির বেসমেন্টে বসে আইপ্যাড চালু করলেন ৬৬ বছর বয়সী লি কোলকার। তিনি অনলাইনে একটি ব্যায়াম সেশনে যোগ দেন, যার অপর প্রান্তে ছিলেন ক্যানসার রোগীদের ব্যায়াম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক অলিভিয়া মাস্টেন। মেটাস্ট্যাটিক কিডনি ক্যানসারের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার পর থেকে কোলকার হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে পড়তেন এবং তাঁর চিন্তাভাবনা ও মনোযোগেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ মেডিক্যাল সেন্টারের কর্মীরা তাঁকে জানান যে, ব্যায়াম করলে তাঁর কর্মশক্তি বৃদ্ধি পেতে পারে। এই সুযোগটি গ্রহণ করে তিনি বলেন, “এ কথাটাই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল।”
ব্যায়ামের সুফল স্পষ্ট হওয়ার সাথে সাথে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ক্যানসার রোগীদের ব্যায়ামে যুক্ত করার উদ্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোলকারও এমনই একটি কর্মসূচির অংশ। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়াম ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে স্তন ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। গত বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়ালে আরও জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ওই গবেষণায় কোলন ক্যানসারের একদল রোগী তিন বছর ধরে একজন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিকল্পিতভাবে ব্যায়াম করেন। দেখা গেছে, তাঁদের ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কম ছিল এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছিল। আট বছর পর এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া রোগীদের ৯০ শতাংশ জীবিত ছিলেন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ দলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৮৩ শতাংশ।
পরবর্তী আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচির ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার খরচও হ্রাস পায়। একজন রোগীর জন্য পুরো কর্মসূচির খরচ হয় ৩ হাজার ডলার। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ফ্রেড হাচ ক্যানসার সেন্টারের ক্যানসার গবেষক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ডা. স্কট র্যামসে এই ফলাফলকে “দারুণ সাফল্য” বলে উল্লেখ করেছেন।
ক্যানসারের চিকিৎসায় একসঙ্গে এমন সুফল পাওয়া বিরল। উদাহরণস্বরূপ, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের নতুন ওষুধ ডারাক্সোনরাসিবের কথা বলা যায়। এই ওষুধটি ব্যবহারে বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার খরচ হয় এবং এর বেশ কিছু অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এটি রোগীর আয়ু কয়েক মাস বাড়ালেও দীর্ঘ মেয়াদে বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি করে না।
ব্যায়াম সংক্রান্ত ওই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন কানাডার অন্টারিওর কিংস্টনে কুইন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও অনকোলজিস্ট ডা. ক্রিস্টোফার বুথ। তিনি বলেন, “এতটা উপকার করে এমন কোনো ওষুধ থাকলে সেটি সঙ্গে সঙ্গেই নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হয়ে যেত। বিমা কোম্পানিগুলোও এর খরচ দিত।”
বর্তমান নির্দেশিকায় অনকোলজিস্টদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন কোলন ক্যানসার রোগীরা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম করতে পারেন। কিন্তু বিমা কোম্পানিগুলো এখনো এই ব্যায়াম কর্মসূচির খরচ বহন করে না, ফলে বড় পরিসরে এই সেবা চালু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ডা. র্যামসে বলেন, “রোগীদের আপনি বলতে পারেন, এটি করলে হয়তো আরও বেশি দিন বাঁচবেন।” তবে এই সুবিধা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকেরা কয়েক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন। শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া এবং তাঁদের কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে কি না তা যাচাই করা হয়েছে। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে এই ধরনের কর্মসূচি মূলত বড় ক্যানসার সেন্টারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব কর্মসূচি চালাতে দাতাদের সহায়তা নেওয়া হয় অথবা রোগীকে নিজের পকেট থেকে খরচ দিতে হয়। ফলে স্বল্প আয়ের রোগীরা এই সুযোগ পান না এবং বড় সেন্টার থেকে দূরে থাকা রোগীদের জন্য এটি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বোস্টনের ডানা-ফারবার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অনকোলজিস্ট জেফ মেয়ারহার্ড তাঁর রোগীদের হাসপাতালের বিকল্প চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠান, যেখানে প্রশিক্ষকের পরামর্শে সরাসরি বা অনলাইনে ব্যায়াম করা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার সুযোগ সেখানে সীমিত। অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোতে চিকিৎসকেরা উপযুক্ত রোগীদের ফিজিক্যাল থেরাপি ও পুনর্বাসন সেবায় পাঠান, যার খরচ বিমা থেকে পাওয়া যায়। এছাড়া ওয়াইএমসিএর অনেক শাখায় ক্যানসার সারভাইভরদের জন্য ১২ সপ্তাহের স্বল্পমূল্যের বা বিনামূল্যে কর্মসূচি রয়েছে।
ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে শুধু ব্যায়াম করতে বললেই হবে না, কঠিন ব্যায়ামের পর্যায়ে যেতে এবং তা নিয়মিত চালিয়ে যেতে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হয়। ইউপিএমসি হিলম্যান ক্যানসার সেন্টারের এক্সারসাইজ অনকোলজি গবেষক ক্যাথরিন শমিৎজ বলেন, “ব্যায়াম শুধু শরীরের বিষয় নয়। এটি আচরণেরও বিষয়।”
ডা. শমিৎজ ‘মুভিং থ্রু ক্যানসার’ কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, যেখানে লি কোলকার অংশ নিচ্ছেন। এখানে প্রতিটি রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হয়। কেউ বেশি সহায়তা পান, আবার কেউ এতটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন যে বাইরে পিকলবল খেলতে পারেন বলে জানান ডা. শমিৎজ।
৬৮ বছর বয়সী কিম্বারলি বার্কার মূত্রাশয় ও জরায়ুর ক্যানসারের চিকিৎসার পর কোমরের নিচে ও নিতম্বে ব্যথার পাশাপাশি প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভুগতেন। কাঁথা সেলাই করা এবং স্বামীর সঙ্গে সাইকেল চালানোর মতো প্রিয় কাজগুলো তিনি করতে পারছিলেন না। বার্কার বলেন, “আমি খুব ক্লান্ত থাকতাম। শরীরে কোনো শক্তি ছিল না। কিছু করার মতো দমও পেতাম না।”
এরপর তিনি টানা ১২ সপ্তাহ প্রতি সপ্তাহে একবার প্রশিক্ষক অলিভিয়া মাস্টেনের সঙ্গে এবং মাঝের দিনগুলোতে নিজস্ব পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করেন। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও তিনি তা চালিয়ে যান এবং এখন তিনি আবার আগের মতো সুস্থ বোধ করছেন ও সাইকেল চালানো শুরু করেছেন।
বার্কারের মতো রোগীদের ইতিবাচক ফল দেখে ইউপিএমসি এই কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী বছর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনার আওতায় স্তন ক্যানসার রোগীদের এই সুবিধা দেবে। ডা. শমিৎজ জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ইউপিএমসিই প্রথম স্বাস্থ্যব্যবস্থা হিসেবে এক্সারসাইজ অনকোলজির খরচ বিমার আওতায় আনবে। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা র্যান্ডোমাইজড ট্রায়ালের ফল তুলে ধরে যুক্তি দিয়েছেন যে, ব্যায়ামের ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, জরুরি বিভাগে যাওয়া এবং হঠাৎ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন কমে, যা সামগ্রিক চিকিৎসার খরচ বাঁচায়।
ডা. শমিৎজ বলেন, “ইউপিএমসির এই উদ্যোগ একটি বড় পরীক্ষা।” এই উদ্যোগ সফল হলে ২০২৮ সালের মধ্যে সব ধরনের ক্যানসার রোগীদের জন্য এই কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে হাসপাতালটির।