রংপুরের জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কার্যকলাপে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রংপুর-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। এমপি হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন থেকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সভায় তিনি বলেন, ‘আমাকে বাধ্য করবেন না থানা ঘেরাওয়ের জন্য, আমাকে বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাওয়ের জন্য। পরিষ্কার বললাম। আমি ভদ্র লোক, কিন্তু অভদ্র হতে বাধ্য করবেন না।’

সংসদ সদস্যের এই উত্তপ্ত বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে তাকে চিৎকার করে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনারা এমপিকে পাত্তা দিচ্ছেন না? হোয়াই? হোয়াই? কী মনে করেন, আমরা আসমান থেকে আসছি? মঙ্গল গ্রহ থেকে আসছি? উই আর দ্য সন অব দিস সয়েল, অব দিস ল্যান্ড। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। আপনারা পাত্তা দিচ্ছেন না কেন? চেয়ার দিতে চান না কেন? জনগণ নিয়ে কি ঘেরাও করব? রাস্তাঘাট চলাচল বন্ধ করে দেব?’

গত রোববার অনুষ্ঠিত এই জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাহবুবুর রহমান। তাঁর নির্বাচনী এলাকাটি রংপুর সদর এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ থেকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। সভায় তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স বা পদমর্যাদাক্রম অমান্য করা, বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখা, সার ডিলার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম এবং নির্দিষ্ট একটি দলের প্রতি পক্ষপাতের গুরুতর অভিযোগ তোলেন।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সতর্ক করে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যদি পাবলিক খেপে যায়, তাহলে কিন্তু সেই খ্যাপানো আপনারা থামাতে পারবেন না, পরিষ্কার বলে দিলাম। সেই ক্ষমতা পুলিশের নাই, কারও নাই। পাবলিক অত বোকা আর নাই। পুলিশকে, র‍্যাবকে আর ভয় পায় না, তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য।’

সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নিয়োগে ‘ন্যক্কারজনক দলীয়করণ’ করা হয়েছে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘সব ডিলার একটা দল থেকে দেওয়া হয়েছে। যদি তা–ই হয়, তাহলে আপনারা অন্যদেরকে এখানে আবেদন করালেন কেন? প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলো কেন?’

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, একই পরিবারের তিনজন সদস্য সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ রকম ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটছে বলে আমি মনে করি না। এটা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ জনগণের মধ্যে আছে। এই অসন্তোষ কত দূর পর্যন্ত যাবে, আমি জানি না। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে এর জবাবদিহি দিতে পারতেছি না। জবাবটা কী হবে, মাননীয় ডিসি ঠিক করে দিলে ভালো হয়।’

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি জেলার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হওয়া সত্ত্বেও সেখানে মহানগর পুলিশ কমিশনার ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের অনুপস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘সিটি নিয়ে আলোচনা হবে; সিটি প্রশাসক নাই, মেয়র নাই, এ তো হতে পারে না! তাঁরা আসবেন না কেন, আমার মাথায় ঢোকে না। এমপিরা যদি থাকতে পারেন, হোয়াই নট প্রশাসক? হোয়াই নট মেয়র? আমি বুঝি না। হোয়াই নট পুলিশ কমিশনার? তাহলে কী তাঁরা আমাদের চেয়েও সুপেরিওর। রুল অব প্রিসিডেন্স, আমি থাকব ওরা থাকবে না কেন? ওরা কি বড় লাটসাহেব হয়ে গেছে? নিজেকে লাটসাহেব ভাববেন না। ইউ আর দ্য সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে সভাটি পুনর্নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া জেলার বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলায় অনেক কমিটি আছে, কিন্তু এমপির কতজন প্রতিনিধি সেখানে আছেন। স্পষ্ট বলা আছে, এমপির প্রতিনিধি থাকতে হবে, সেখানেও নাই। সমস্ত একটা দল তাদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এটা কি গণতন্ত্র? এর মাধ্যমে কি জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে?’

জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী এবং রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিনসহ মহানগর ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমানের এসব বক্তব্যের জবাবে জেলা প্রশাসক ও কমিটির সভাপতি ইসরাত জাহান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা কমিটি জেলার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। এখানে সরকারি কর্মকর্তাসহ উপস্থিত সবার পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে আলোচনা করা সমীচীন। যেকোনো বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সবারই শব্দচয়নের ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকা উচিত।’