রংপুর জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া এবং পদমর্যাদাক্রম বা 'ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স' অমান্য করার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন রংপুর-৩ আসনের জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য (এমপি) মাহবুবুর রহমান বেলাল। রোববার (১১ অক্টোবর) জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সভায় উপস্থিত হয়ে এমপি মাহবুবুর রহমান বেলাল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, "আপনারা এমপিদের পাত্তা দিচ্ছেন না। হোয়াই? হোয়াই? কী ভেবেছেন আপনারা? আপনারা আসমান থেকে এসেছেন? মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন? উই আর দ্য সনস অব দিস ল্যান্ড সয়েল। আমাদের জনগণ ভোট দিয়েছে। আমাদের পাত্তা দেন না কেন? কেন? কেন?"

তিনি অভিযোগ করেন যে, রাষ্ট্র নির্ধারিত পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের যে সম্মান পাওয়ার কথা, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। জনপ্রতিনিধিদের জনগণের স্বার্থে কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপেক্ষা করার বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমরা ভদ্রলোক। পাশাপাশি আমরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধি। জনগণের ন্যায্য দাবিতে বাধ্য হয়ে আমাকে আন্দোলনে নামতে হবে। আমার মূল শক্তি হলো জনগণ।"

সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তোলেন এই সংসদ সদস্য। তার দাবি, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে দলীয় পরিচয়ে অযোগ্য ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, "একটি সার ডিলারশিপের জন্য অনেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী আবেদন করেছেন, সমস্ত শর্ত পূরণ হয়েছে। বাট সে পেল না। পেল কে? দলীয় পরিচয়ে একজন বিশেষ লোক, যার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, কোনো গোডাউন নেই, কোনো সলভেন্সি নেই। তারপরও সে কীভাবে পেল?"

ডিলার নিয়োগে একই পরিবারের একাধিক সদস্য এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "সারের বিষয়ে একটি লজ্জাজনক, ন্যক্কারজনক দলীয়করণ হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা করছি। সব ডিলার একটি দল থেকে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলেন কেন?"

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে সংসদ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার বিষয়েও কথা বলেন এমপি বেলাল। তিনি বলেন, "জেলায় অনেক কমিটি আছে। আপনারা জানেন, অনেক কমিটি। কিন্তু এমপির কয়জন প্রতিনিধি সেখানে আছেন? সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, এমপির প্রতিনিধি থাকবে। সেটাও নেই।"

এছাড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, মেয়র এবং পুলিশ কমিশনারের সভায় অনুপস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "সিটি নিয়ে আলোচনা হবে, আর সিটি প্রশাসক থাকবেন না, বা মেয়র থাকবেন না এটা তো হতে পারে না। তাঁরা আসবেন না কেন, আমি বুঝি না। আমার মাথায় ঢোকে না। এমপিরা যদি থাকতে পারেন, হোয়াই নট প্রশাসক, হোয়াই নট মেয়র? আমি বুঝি না। হোয়াই নট পুলিশ কমিশনার?"

প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি কর্মকর্তাদের বলেন, "আপনাদের তামাশা আমরা দেখছি। আপনারা একটি দলের তেল মারছেন। কত তেল মারবেন?" পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, "আমাদের বাধ্য করবেন না থানায় ঘেরাও করার জন্য। আমাদের বাধ্য করবেন না ডিসি অফিস ঘেরাও করার জন্য।"

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে এমপি বেলাল আসন্ন দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানান। তিনি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের নজরদারির পরামর্শ দেন। এছাড়া শ্যামা সুন্দরী খাল সংস্কার, যানজট নিরসন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, মাদকবিরোধী অভিযান এবং ঢাকা কোচ স্ট্যান্ড শহরের বাইরে স্থানান্তরের বিষয়েও তিনি বক্তব্য রাখেন।

এমপি বেলালের এই কড়া বক্তব্যের জবাবে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান শব্দচয়নের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "আমার মনে হয়, আমাদের সব সদস্যকেই শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্কভাবে কথা বলা দরকার। কারণ, এটি একটি জেলার সর্বোচ্চ ফোরাম। এখানে সব সরকারি কর্মকর্তা আছেন। তারা সবাই যোগ্যতার ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেয়েছেন।"

ডিসি আরও বলেন, "কাকে কীভাবে, কতটুকু বলব, সে ক্ষেত্রে আমাদের সবারই সম্মান বজায় রেখে কথা বলার সুযোগ আছে। বিশেষ করে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে। আমরা কোন ভাষায়, কী শব্দ বলব, কোন জায়গায় বলব—এসব বিষয়ে আমাদের সবারই খেয়াল রাখা উচিত।"

উল্লেখ্য, রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে এই সভাটি শুরু হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। উপস্থিত ছিলেন রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিনসহ জেলা ও মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।