ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলন চলছে। ব্যাপক ধরপাকড় ও দমন-পীড়নের মুখেও দমে যাওয়ার কথা নয় বলে জানিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা। গতকাল রোববারও এই আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মূলত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেই এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
গত শনিবার বিক্ষোভ দমনে পুলিশ বড় ধরনের ধরপাকড় অভিযান চালায়। এই অভিযানে সিজেপির নেতা এবং বিভিন্ন বিরোধীদলীয় নেতাসহ হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়। তবে পরবর্তীতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই আটক প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করলে গতকাল অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়ার পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য “অস্বস্তির কারণ”। এই দেশ আগে কখনো তাঁর চেয়ে বড় কাপুরুষ ও দাদাগিরি করা লোক দেখেনি।’
বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ হলো, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের (এসআইআর) নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সুবিধা হচ্ছে। এই কারণেই তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কারিগরি ত্রুটি এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এই বিক্ষোভ কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে দুজন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের এই দাবিতে তরুণদের পাশাপাশি ভারতের বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া ব্লক’ অংশ নিয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই জোট এখন আন্দোলনের সাথে যুক্ত।
সরকার যেভাবে ধরপাকড় চালিয়েছে
শনিবারের বিক্ষোভের আগে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে নয়াদিল্লিকে। বিক্ষোভকারীরা যাতে পার্লামেন্টের নিকটবর্তী নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন, সেজন্য শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। ট্রেন ও মেট্রো চলাচল বন্ধ রাখা হয় এবং বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো আটকে দেওয়া হয়। ব্যারিকেড দিয়ে যন্তর মন্তর এলাকাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর আগে গত জুলাই মাসে এই যন্তর মন্তরেই সিজেপির বড় বিক্ষোভ হয়েছিল, যার চাপে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। নিটসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল।
বর্তমান বিক্ষোভ ঠেকাতে ২ কোটি মানুষের শহর নয়াদিল্লির প্রবেশপথে ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। বাসে তল্লাশি এবং যানবাহন পরীক্ষার ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বসানো হয় এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ যান মোতায়েন করা হয়, যাতে কাঁদানে গ্যাসের সরঞ্জাম ছিল।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শহরজুড়ে ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। সিজেপি ও অন্যান্য সংগঠন যাতে অনলাইনে মানুষকে সংগঠিত করতে না পারে, সেজন্য রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় ইন্টারনেট-সেবা বন্ধ রাখা হয়।
মুম্বাই থেকে নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর পর একটি উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা দিপকে এবং তাঁর সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে। ইনস্টাগ্রামে অভিজিতের পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটি অবতরণের পর পুলিশের একটি দল ভেতরে ঢুকছে। পুলিশের সদস্যরা তাঁর কাছে এগিয়ে গেলে দিপকে বলেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি। আপনাদের ভয় পাই না।’
রাঙ্কার পোস্ট করা আরেকটি ভিডিওতে দিপকে বলেন, ‘এটা স্বৈরাচারী শাসন।’
দিল্লি পুলিশ জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং বামপন্থী সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করে। এই সংগঠনটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) সঙ্গে যুক্ত। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিরোধী রাজনীতিকদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও আটক করা হয়েছিল।
এত কঠোর পদক্ষেপের মধ্যেও দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়, যার মধ্যে দিল্লি হাটও ছিল। তবে পুলিশ দ্রুত সেগুলো ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এমনকি সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদেরও আটক করা হয়। সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ ঘিরে প্রায় ৬০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের মুক্তির পরিস্থিতি
গতকাল রোববার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আটক সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সিজেপির নেতাদের এক বছরের জন্য ‘শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার’ শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেন সিজেপির নেতা সৌরভ দাস। পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পুলিশ ‘মাফিয়া ডনদের মতো’ আচরণ করেছে এবং উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাঁদের অপহরণ করেছে।
ধ্রুব রাঠি মুক্তির পর বলেন, তাঁকে আটক বা গ্রেপ্তার নয়, ‘অপহরণ’ করা হয়েছিল।
নিউজলন্ড্রি জানিয়েছে, আটক করা কয়েকজন প্রতিবেদকের সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছিল। সাংবাদিকদের সাময়িকভাবে আটক করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সংগঠনটির এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পুলিশের সদস্যরা যেমন তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন, সাংবাদিকেরাও তেমনি তাঁদের কাজ করছেন। গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম অপরিহার্য।’
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ
সিজেপির নেতারা দিল্লিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকালও সংগঠনটির কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। যন্তর মন্তরে সমাবেশের অনুমতির জন্য আজ সোমবার তাঁরা পুলিশের সঙ্গে দেখা করলেও পুলিশ অনুমতি দেয়নি। ফলে তাঁরা এখন নতুন করে জ্ঞানেশবিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন।
সৌরভ দাস এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করেছেন এবং নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, তরুণ প্রজন্ম জবাবদিহি দাবি করে যাবে। ভয় দেখিয়ে বা কণ্ঠ রোধ করে তাদের থামানো যাবে না। তারা আরও শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে।
সিজেপি গতকাল সন্ধ্যায় মুম্বাইসহ ভারতের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা গতকাল বিকেলে দিল্লির কেন্দ্রস্থলে কে আশ্রমে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তাঁকে আটক করে নিয়ে যায়।
বিরোধী দলগুলোর অবস্থান
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্ডিয়া ব্লক। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নিতে আগের দিন বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে বিস্তারিত বৈঠক করেছেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘জ্ঞানেশকে বিদায় নিতেই হবে। আমরা পিছু হটব না।’
বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী গত কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন। গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের ঘটনায় তাঁকেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, আটক, গ্রেপ্তার, কারাগার, লাঠিপেটা কিংবা ছররা গুলি ভারতের মানুষকে দমাতে পারবে না। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই তরুণেরা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন।
সরকারের অনড় অবস্থান
গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে দুজন প্রশ্ন তুলেছিলেন। এরপরই বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়।
বিজেপির দাবি, বাদ পড়া ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তির, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে গেছেন, ১ কোটি নাম একাধিকবার রয়েছে এবং ৩ কোটি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি। ক্ষমতাসীন দলটির মতে, নির্বাচনে তাদের সাফল্যের পেছনে মোদির জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভূমিকা রয়েছে। তারা বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছে।
তবে এই বিক্ষোভ এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মোদি সরকারের আমলে গণতন্ত্র, ভিন্নমত প্রকাশ এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। জুলাইয়ের বিক্ষোভের সময় সরকার তরুণদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও এবার সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের পদত্যাগের দাবির মুখে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁদের ‘ব্যর্থ প্রদর্শনী পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে’। তিনি আরও দাবি করেন, যন্তর মন্তরে যা ঘটছে, তা ভারতের সামগ্রিক চিত্র নয় এবং পরিস্থিতি শান্ত।
তবে আল-জাজিরার সাথে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ মেনে নিলে ভোট চুরির অভিযোগ কার্যত স্বীকৃতি পাবে এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হার্ড নিউজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সঞ্জয় কাপুর বলেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই চান না, মোদির বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক। তাঁর ভাষায়, মোদি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন অনেকটাই কমতে শুরু করেছে। সঞ্জয় কাপুরের মতে, বিজেপি ভয় পাচ্ছে যে জনমত দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, যা পরবর্তী নির্বাচনে তাঁদের জন্য কঠিন হবে।