ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকেকে গতকাল শনিবার পুলিশ আটক করেছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণ প্রজন্মের প্রতি ‘তেলাপোকা’ বলে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করার পর সেই শব্দের পাল্টা জবাব দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন দিপকে। সেই একটি পোস্ট থেকেই দেশজুড়ে এক বিশাল আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি সামনে আসায় এই আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। গত জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের এই প্রবল আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল পূর্বঘোষিত একটি সমাবেশে অংশ নিতে নয়াদিল্লি যাচ্ছিলেন অভিজিৎ দিপকে। তবে তাঁর উড়োজাহাজটি রাজধানীতে অবতরণ করার পরপরই পুলিশ সেখানে পৌঁছে তাঁকে আটক করে।
মূলত ভোটার তালিকা নিয়ে কারসাজির অভিযোগের প্রতিবাদ জানাতে এই বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। সমালোচকদের দাবি, ভোটার তালিকার খসড়া সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
আটক হওয়ার সময় উড়োজাহাজের ভেতর থেকে পুলিশের উদ্দেশ্যে দিপকে বলেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন...আমি আপনাদের ভয় পাই না।’
টেলিভিশনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন পুলিশ কর্মকর্তা দিপকেকে আশ্বস্ত করে বলছেন, ‘আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না; বরং আপনার সহযোগিতা চাইছি।’
৩১ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে ভারতের বর্ণপ্রথার নিচু স্তরের দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। চলতি বছর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার যখন তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন, তখন তার প্রতিবাদে দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র ছয় শব্দের একটি পোস্ট দেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
সেই ভাইরাল পোস্ট থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। শুরুর দিকে এটি কেবল একটি অনলাইনভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে পরিচিত থাকলেও, খুব দ্রুতই এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির এক শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয়।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভারতজুড়ে বড় বড় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর গত জুলাই মাসে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। টানা ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় এমন পদত্যাগের ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে মনে করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়েছে। গতকাল নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগেই দিপকেকে আটক করা হয়।
তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৩ কোটির এই সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি হলেও এই নামগুলো চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়নি। খসড়া সংশোধনের সময় এই নামগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ভুলবশত বাদ পড়া ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধন করার সুযোগ পাবেন।
সাধারণত টি-শার্ট ও জিনস পরিহিত শ্মশ্রুমণ্ডিত দিপকেকে দেখা যায়। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ইতিপূর্বে দিপকে ও তাঁর সহযোগীরা দক্ষিণ ভারতের প্রযুক্তিনগরী বেঙ্গালুরুতে এক বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেখান থেকে মুম্বাই হয়ে গতকাল রাজধানীতে পৌঁছানোর পর তাঁকে আটক করা হয়। তাঁর পাশাপাশি সিজেপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাও পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন।
দিল্লিতে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিক্ষোভের ওপর কড়াকড়ির মাঝেও দিপকে তাঁর সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান জানান। এই ক্ষেত্রে তিনি ভারতের অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎ মহাত্মা গান্ধীর উদাহরণ টেনে বলেন। গতকাল মুম্বাই থেকে ফ্লাইটে যাত্রা করার আগে রেকর্ড করা একটি ভিডিও বার্তায় দিপকে বলেন, ‘আগামীকাল কী হবে আমি জানি না। কিন্তু একটি বিষয়ে নিশ্চিত, আমি ভয় পাব না। পিছুও হটব না। আমাদের গণতন্ত্র বাঁচাতে হবে।’
ওই ভিডিও বার্তায় দিপকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘দেশের তরুণদের, দেশের মানুষকে এত ভয় কেন প্রধানমন্ত্রীর?’
তরুণদের এই বিক্ষোভ দমনে দিল্লিতে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থা এবং টেলিযোগাযোগ সংযোগও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ সম্বোধনের জবাবে দিপকের সেই ছয় শব্দের পোস্টটি ছিল, ‘হোয়াট ইফ অল দ্য ককরোচেস কাম টুগেদার?’ যার অর্থ হলো—সব তেলাপোকা যদি এক হয়, তবে কী হবে?
গত মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্থাপিত এই প্রশ্নটি রাতারাতি দিপকেকে ভারতের তরুণ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে দক্ষ দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে আন্দোলনে যোগ দিতে ভারতে ফিরে আসেন।
দিপকের মতে, ভাইরাল হয়ে ওঠার বিষয়টি তাঁকে ‘বাস্তব ও অর্থবহ কাজ করার সুযোগ’ করে দিয়েছে। তবে এই জনপ্রিয়তার পর থেকে তিনি এবং তাঁর পরিবার একাধিকবার বিভিন্ন হুমকি পেয়েছেন।
গত কয়েক মাসে অনলাইনে সিজেপির লাখ লাখ অনুসারী তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে এই সংগঠনটি বড় ভূমিকা পালন করে। ওই ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে আন্দোলনের সব ক্ষোভ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ওপর কেন্দ্রীভূত হয় এবং গত ২৫ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।
এরপর থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দিপকে ও তাঁর সমর্থকেরা সোচ্চার হয়েছেন। তাঁদের দাবি, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি সরকারের ওপর চাপ তৈরির একটি সামাজিক আন্দোলন।
সরকারি স্কুলের অবকাঠামোগত সমস্যা থেকে শুরু করে তরুণদের কর্মসংস্থান—এমন নানা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রচার চালিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে সিজেপি। এই প্রেক্ষাপটে গত মাসে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সিজেপি পুনরায় রাজপথে নামে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি এবং নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা একটি স্বাভাবিক বিষয়।