ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল শনিবার উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লি। বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাজধানীর যন্তর মন্তর চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে এই কর্মসূচিটি কেবল একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সব বিরোধী দলের একজোট হওয়া কর্মসূচিতে পরিণত হতে যাচ্ছিল।
বিক্ষোভের মুখে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যন্তর মন্তরে কোনো ধরনের সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আগের দিন শুক্রবার থেকেই দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যানবাহনে কঠোর তল্লাশি চালানো হয় এবং মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এছাড়া অনেক এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল।
শুক্রবার দিবাগত রাত থেকেই শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। গতকাল সকালে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেসহ দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা, জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে আটক করা হয়। তবে পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বর্তমানে ভারতে প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশোধন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকায় এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের জন্য সুবিধা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।
জ্ঞানেশ কুমারের এই সংকটময় পরিস্থিতিকে বিজেপির জন্য এক ধরনের ‘উভয়সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে ভারতের সুপরিচিত সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু।
বিশ্লেষক ভার্গিস কে জর্জ লিখেছেন, “জ্ঞানেশকে দায়িত্বে রাখা কিংবা তাঁর বিদায়—দুই ক্ষেত্রেই বিজেপির জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।” তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বরখাস্ত করতে পারে না; তাঁকে অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়াদের শুরু থেকেই বিরোধীদের সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের সম্পর্ক টানাপোড়েনপূর্ণ। এ বছর তাঁকে অপসারণের দাবিতে সংসদে একটি প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়েছিল, যদিও সেটি গৃহীত হয়নি। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জ্ঞানেশের পদে থাকা বা সরে যাওয়া—উভয় বিষয়ই ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষণটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, “জ্ঞানেশের পর যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন, তিনি বর্তমান কমিশনের মতো একই পথে চলবেন, এ নিশ্চয়তা বিজেপির নেই।”
ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে জ্ঞানেশ কুমার হয়তো নিজের নিরপেক্ষতা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারেন। তবে বিরোধীরা যে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলছে, তার ফলে তাঁর দায়িত্বে থাকাকালীন জন-অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।