গুলশান অ্যাভিনিউতে অবস্থিত সিম্পলট্রি আনারকলি দেশের প্রথম লিড (এলইইডি) গোল্ড সনদপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে অনন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘সিম্পলট্রি’র দাবি অনুযায়ী, ভবনটিতে এলইডি বাতি ও মোশন সেন্সরের ব্যবহার এবং এমন এক বিশেষ নকশা করা হয়েছে যার ফলে ভবনের অভ্যন্তরে প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গায় দিনের আলো পৌঁছায়। এই আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার কারণে ভবনটি বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম হচ্ছে।

বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে যখন সব স্তরেই ‘গ্রিন বিল্ডিং’ বা পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) এলইইডি গোল্ড সনদ পাওয়া প্রকল্পের সংখ্যার দিক থেকে তারা দেশে শীর্ষস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পরিবেশবান্ধব নির্মাণ কৌশলে অর্জিত এই অগ্রগতিকেই সিম্পলট্রির কর্মকর্তারা তাদের সবচেয়ে ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

সিম্পলট্রির এই যাত্রার নেপথ্যে রয়েছেন একজন দক্ষ স্থপতি। মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বুয়েটে শিক্ষকতা করে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় স্থাপত্য নকশার কাজ করছেন। ২০০৮ সালে তিনি নকশা প্রতিষ্ঠান ভলিউমজিরো লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছর মোরশেদা নাসমীনের সঙ্গে যৌথভাবে স্পেসজিরো লিমিটেড গঠন করেন তিনি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভলিউমজিরোর করা নকশাগুলো যেন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি না ঘটে এবং ঠিক যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে সেভাবেই গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই যাত্রায় যুক্ত হয় ভবন ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এফএমএস স্পেসজিরো এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইন প্রতিষ্ঠান সিম্পল স্পেস। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়েই আজকের সিম্পলট্রি গড়ে উঠেছে।

ঢাকার মতো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সীমিত জায়গার মধ্যে সর্বোচ্চ আলো, বাতাস এবং সবুজের সমন্বয় ঘটানোই সিম্পলট্রির মূল নকশাদর্শন। এই দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় আনারকলি ভবনে। এখানে এলইডি বাতি ও মোশন সেন্সরের পাশাপাশি দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের নকশা করা হয়েছে। এছাড়া ভবনের দেয়ালজুড়ে রয়েছে ভার্টিক্যাল গার্ডেন, বিভিন্ন স্তরে জলাধার এবং নিচু বাগান, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ সংযোজন গুলশান অ্যাভিনিউতে অবস্থিত ২৪ তলা বিশিষ্ট সিম্পলট্রি জিএসআর ভবনটি, যা ২০২৫ সালে ইউএসজিবিসির এলইইডি গোল্ড সনদ লাভ করেছে। এই ভবনেই অবস্থিত সিম্পলট্রির করপোরেট কার্যালয়। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্কের পাশে নির্মিত এই ভবনের নকশায় সবুজ ছাদ, ছাউনি দেওয়া টেরাস এবং খোলা প্লাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া লাইটহাউস ও অ্যাট্টালিকা ভবন দুটিও এলইইডি গোল্ড সনদ অর্জন করেছে।

সিম্পলট্রির অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্মাণ, ইন্টেরিয়র ডিজাইন এবং হস্তান্তরের পর ভবন ব্যবস্থাপনা—সবই একটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অধীনে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই সমন্বিত প্রক্রিয়ার ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়, কাজে সমন্বয় বৃদ্ধি পায় এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তর সহজ হয়।

এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৩১টি প্রকল্প সফলভাবে হস্তান্তর করেছে এবং বর্তমানে ১৫টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত তারা প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামনে আরও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য নতুন প্রকল্প নিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ তাঁদের কাছে কেবল বাড়তি কোনো সুবিধা নয়, বরং এটি তাঁদের অঙ্গীকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের বিশ্বাস, প্রতিটি জায়গার একটি প্রাণ আছে, আর প্রতিটি প্রাণের আছে নিজের গল্প।