স্বীকার করুন বা না করুন, বর্তমান বাস্তবতায় পাকিস্তানের রাজনীতি গত তিন বছর ধরে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সেই ব্যক্তির নাম ইমরান খান।
গত ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট একটি আদেশ প্রদান করেন, যেখানে বলা হয় দুই দিনের মধ্যে ইমরান খানকে ইসলামাবাদের আল-শিফা হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। তবে শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে ইমরান খানকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) নিয়ে যায়। এরপর পুনরায় তাঁকে আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে বন্দী করে রাখা হয়।
এদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি, যিনি ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) একজন নেতা, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদের দিকে লংমার্চ করার ঘোষণা দেন। এই লংমার্চ রুখতে কেন্দ্রীয় সরকার পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। তবে আফ্রিদি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইমরান খান যদি তাঁদের লংমার্চ বন্ধ করতে বলেন, তবেই তাঁরা তা বন্ধ করবেন। কেন্দ্রীয় সরকার এই শর্তে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য আফ্রিদিকে দায়ী করে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
গভর্নরের শাসন জারির অর্থ হলো পাখতুনখাওয়ায় আফ্রিদির সরকারের পতন। তবে এর ফলে লংমার্চ থেমে থাকেনি। গত রোববার শাহবাজ শরিফ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন, যেখানে সোহেল আফ্রিদিকে সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী হিসেবে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
পাকিস্তানের কোনো প্রদেশে গভর্নরের শাসন জারি করা নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিতাপের বিষয় হলো, সেই তিক্ত ইতিহাসই বারবার ফিরে আসছে।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মুসলিম লীগ পরাজিত হয় এবং যুক্তফ্রন্টের শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ কে ফজলুল হককে দেশের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর ইস্কান্দার মির্জার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহিবজাদা ইয়াকুব আলী খানকে গভর্নর করা হয় এবং তাঁকে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি যখন তা করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।
পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পরও পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি। ১৯৭৩ সালে বেলুচিস্তানের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ মেঙ্গলের সরকারকে বরখাস্ত করে সেখানে গভর্নরের শাসন জারি করা হয় এবং আকবর বুগতিকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে মাত্র ১০ মাস পর তিনি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ১৯৭৫ সালে ভুট্টোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হায়াত মুহাম্মদ খান শেরপাও পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে এর জন্য ওয়ালি খান ও তাঁর সহযোগীদের দায়ী করা হয়। এরপর ওই প্রদেশে পুনরায় গভর্নরের শাসন জারি করা হয় এবং সাবেক আইএসআই কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সৈয়দ গাউসকে গভর্নর করা হয়, তবে তিনিও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন।
আজকের বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তারা ৫০ বছর আগে ছিল। ১৯৭৩ সালে গভর্নর হওয়া আকবর বুগতিকে ২০০৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশদ্রোহী ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে বেলুচিস্তানের পাহাড়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
আতাউল্লাহ মেঙ্গল ও ওয়ালি খানকে দেশের শত্রুদের সহযোগী বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। আর যে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁকে ১৯৭৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতেই ফাঁসিতে ঝুলতে হয়।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ২০১৮ সালে ইমরান খানও সামরিক জেনারেলদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই জেনারেলদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। জেনারেলরা ধারণা করেছিলেন, নওয়াজ শরিফের মতো রাজনীতিকেরা কারাগারে যাওয়ার পর সমঝোতা করে সৌদি আরব বা যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন, ইমরান খানও হয়তো বেশি দিন কারাগারে থাকতে পারবেন না এবং সমঝোতা করে বিদেশে চলে যাবেন। কিন্তু নওয়াজ শরিফের মতো হতে অস্বীকৃতি জানান ইমরান খান।
শাহবাজ শরিফের সরকার তাঁকে মুক্তি দেওয়ার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়, এমনকি হাসপাতালে স্থানান্তর করতেও রাজি নয়। সুপ্রিম কোর্টের ১৮ আগস্টের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নরের শাসন জারি করতে হতো না এবং লংমার্চের পরিস্থিতিও তৈরি হতো না। সোহেল আফ্রিদির লংমার্চ ছিল ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে। কিন্তু শাহবাজ শরিফও নিজের একধরনের লংমার্চ শুরু করেছেন, যা পাকিস্তানকে বেসামরিক স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শাহবাজ শরিফ সরকারের দাবি, তারা যা করছেন সব কিছুই সংবিধানের আওতায় করছেন। কিন্তু সংবিধান তাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশও দেয়, যা তারা উপেক্ষা করেন। যখন সংবিধান তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তারা তা মানেন না; আবার যখন সংবিধান তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হয়, তখন তারা সংবিধানের বড় রক্ষক হয়ে ওঠেন। ইমরান খানও অনেকটা একই কাজ করতেন; তিনি শাহবাজ শরিফসহ বহু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন এবং আমার মতো একজন সাংবাদিকের ওপরও ৯ মাস নিষেধাজ্ঞা রেখেছিলেন।
তবে এখানে একটি পার্থক্য বিদ্যমান। বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে ইমরান খানের সরকারকে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা মিশ্র শাসনব্যবস্থার মধ্যে রাখা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান শাহবাজ শরিফের সরকারকে ‘অথোরিটারিয়ান রেজিম’ বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে রাখা হয়েছে।
এমন এক সময়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে, যখন ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। ভারত সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত করেছে এবং পাকিস্তানের নদীগুলোর পানিপ্রবাহ ঘুরিয়ে দিতে নতুন প্রকল্প শুরু করেছে। পাশাপাশি আফগানিস্তান থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছে।
কয়েক মাস আগেও পাকিস্তানের শাসকেরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে গর্ব করছিলেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের প্রশংসা করছিলেন। পরে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেন। এরপর সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পাকিস্তান। পাকিস্তান সরকার বলছে, যেকোনো মূল্যে তারা সৌদি আরবকে রক্ষা করবে। সৌদি আরবকে অবশ্যই রক্ষা করা হোক, তবে তার আগে পাকিস্তান সরকারের নিজের ঘর সামলানো উচিত।
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচকে (২০২৬) পাকিস্তান প্রথম স্থানে রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় শাহবাজ শরিফের সরকারকে সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এমন কোনো ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয় যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। এ ধরনের নীতি ওই প্রদেশে শান্তি আনবে না।
শাহবাজ শরিফের সরকার ইমরান খানভীতিতে বন্দী হয়ে পড়েছে। এই বন্দী সরকার পাকিস্তানকে বেসামরিক স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সরকারকে ইমরান খানভীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিণতি থেকেও শিক্ষা নিতে হবে।
(হামিদ মির: পাকিস্তানের সাংবাদিক। তিনি একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেছেন এবং বিভিন্ন সরকারের আমলে বহুবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন।)