‘আমার ছেলেটার খুব কষ্ট হচ্ছিল। ভেতরে কী যন্ত্রণা চলছিল, তা বোঝাতে পারছিল না। হঠাৎ তার নানি দেখতে পান, তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এ কথা শুনেই আমি আর তার মা আইসিইউতে ঢুকি। সেখানে যেতেই ‘বাবা’, ‘মা’ বলে ডেকে ওঠে ইয়াসির। এরপর একটু হেসেই নিস্তেজ হয়ে যায়। ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।’
সন্তান ইয়াসির আরাফাতের অকাল মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে বারবার কথা হারিয়ে ফেলছেন বাবা রুবেল হোসেন। কথা বলতে বলতে বারবার চোখ মুছছেন তিনি। টিনের ছাউনির একটি ছোট ঘর, তার সামনের কক্ষের সোফায় বসে কথা বলছিলেন রুবেল। পরনে নীল পাঞ্জাবি এবং মাথায় টুপি। কিছুক্ষণ আগেই তিনি ছেলের কবরে জিয়ারত করে ফিরে এসেছেন। আলাপ চলাকালীন মুঠোফোনে ছেলের ছবি দেখাতেই তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুর কবলে পড়ে মারা যায় রুবেলের তিন বছর বয়সী শিশুপুত্র ইয়াসির আরাফাত।
রুবেল হোসেন পেশায় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্রেনচালক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের গামারিতলা এলাকায় তাঁর ছোট একটি বাড়ি রয়েছে। যে বাড়িতে একসময় আনন্দ-কোলাহল ছিল, এখন সেখানে এক নিস্তব্ধতা। বাড়ির দুই পাশে বয়ে চলা খোলা নালায় প্রচুর মশার লার্ভা জমে থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, এই নালা থেকে জন্মানো মশার কামড়েই তাঁর সন্তান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল।
গতকাল রোববার সকালে সোনাইছড়ির বাড়িতে রুবেলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তাঁর স্ত্রী জান্নাতুল নাইমা মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। এই শোকের মুহূর্তে স্বজনেরা তাঁকে তাঁর বাবার বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
রুবেল হোসেন জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইয়াসিরের প্রথমবার জ্বর আসে। শুরুতে জ্বরের তাপমাত্রা ছিল ১০১ ডিগ্রি। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা শুরু করার পর এক দিনের মধ্যেই জ্বর সেরে যায়। কিন্তু গত মঙ্গলবার হঠাৎ করেই তার শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। আবারও চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু এবার আর জ্বর কমছিল না। ওই দিন থেকেই ইয়াসিরের খিঁচুনি শুরু হয়। এক দিন পর বৃহস্পতিবার হঠাৎ তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। দ্রুত তাকে ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে ভর্তি করা হয়নি। চিকিৎসকেরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
রুবেল হোসেন বলেন, দ্রুত ছেলেকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে প্রথমে চিকিৎসকেরা তাকে রাখতে রাজি হননি। তবে অনেক প্রচেষ্টার পর তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার দুপুরে ইয়াসিরের রক্তবমি শুরু হয় এবং পায়খানার সঙ্গেও রক্ত যাচ্ছিল। চিকিৎসকেরা তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় অক্সিজেন দিতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সে চিরতরে বিদায় নেয়।
মাত্র ছয় মাস আগে রুবেল হোসেন তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই একমাত্র সন্তানকে হারানোর আঘাত তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্বজনদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ইয়াসির মুখের বুলি ফোটার পর থেকেই কথা বলে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখত। রাস্তায় চলাচলের সময় যাকে দেখত, তার সঙ্গে কথা বলতে চাইত সে। এমন প্রাণচঞ্চল সন্তানকে হারিয়ে বাবা-মা কীভাবে বেঁচে থাকবেন, তা ভেবে দিশেহারা স্বজনরা।
মুঠোফোনে ইয়াসিরের একটি ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন রুবেল হোসেন। গত ঈদের সময় তোলা সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইয়াসিরের পরনের পাঞ্জাবিটি পায়ের গোড়ালির কাছে নেমে এসেছে। এক হাত মেলে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে সে। ছবিটির দিকে তাকালেই রুবেলের মনে পড়ে সেই স্মৃতিগুলো। তিনি শুধু বলেন, ‘ছেলেটার জন্য দোয়া কইরেন।’
এলাকায় একের পর এক ডেঙ্গু আক্রান্তের ঘটনা প্রসঙ্গে সোনাইছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শোভন ভৌমিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মশকনিধন কার্যক্রমে তাঁর ইউনিয়নের আট গ্রাম পুলিশসহ তিনি সপ্তাহের সাত দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন। ওষুধ ছিটিয়েও ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যতক্ষণ না স্থানীয় বাসিন্দারা সচেতন হবেন, ততক্ষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হবে। এ জন্য প্রত্যেক মানুষকে সচেতন হতে হবে। বৃষ্টির পানি জমে থাকলে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। নিজেরা আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে।”