চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা জামাল খান। সেখানে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের নিচের ফুটপাতে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। মশারি টানিয়ে সেখানে বসে আছেন চারজন তরুণী। তাঁরা গৃহহীন নন, বরং এই অভিনব প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁরা একটি বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং মশা দমনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চরম ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানাতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রেসক্লাবের সামনে এই ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। কর্মসূচির পাশাপাশি সেখানে প্রচারপত্র বিলি করা হয় এবং একটি বোর্ডে লেখা ছিল ‘মেয়র বড় নাকি মশা বড়’।
জুলাই যোদ্ধা হাশমিরা হায়দার চৌধুরী নামের এক তরুণীর উদ্যোগে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিটি আয়োজন করা হয়। এই কার্যক্রমে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সাদিয়া আফরিন, নুসরাত জাহান, তানিয়া আমিন, আয়শা চৌধুরী এবং আবদুল্লাহ আল মামুন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে পথচারীদের অংশগ্রহণে একটি গণশুনানির আয়োজন করা হয়। এই গণশুনানিতে সাধারণ নাগরিকরা বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি, সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের অকার্যকারিতা এবং নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ নিয়ে নিজেদের ক্ষোভ ও মতামত ব্যক্ত করেন।
গণশুনানির সময় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শোনা যায়। সেখানে ব্যঙ্গাত্মকভাবে স্লোগান দেওয়া হয়, ‘মশা বড় নাকি মেয়র বড়?’। অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, মশকনিধনে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে মশা মরছে না। তবে ওষুধের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার এই দাবিটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই কর্মসূচি প্রসঙ্গে হাশমিরা হায়দার চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘মেয়রের কাছে কী মনে হয়—তাঁর, নাকি মশার ক্ষমতা বেশি। বর্তমানে আমাদের মনে হচ্ছে মশার ক্ষমতা বেশি। এ জন্য আমরা মশারির ভেতর থেকে কথা বলছি, বের হতে পারছি না। কিন্তু বারবার সরকারি দলের নেতারা ও মেয়র ভুলে যান, আমরা শহীদ ওসমান হাদির উত্তরসূরি, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুসারী, এক দফার ঘোষক নাহিদ ইসলামের অনুসারী। আমাদের আটকে রাখা সম্ভব নয়।’
এদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে এই বিভাগে ৬ জনের মৃত্যু হলেও কেবল সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ডেঙ্গুতে মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩ শতাংশ মৃত্যুই ঘটেছে সেপ্টেম্বর মাসে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্যানুসারে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল একজনের। জুনে দুজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে একজন মারা যান। কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মৃত্যুর পাশাপাশি রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে বিভাগে ৫ হাজার ৫৮০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, যেখানে আগস্ট মাসে রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮৭৫ জন। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৭০৫ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলতি বছরে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ১১ হাজার ১৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।