গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ দেখা গিয়েছিল, যেখানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে এবং ৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেপ্টেম্বর মাস থেকে আবারও বাড়তে শুরু করেছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। উদ্বেগের বিষয় হলো, মোট আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশিই বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বরগুনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও সেপ্টেম্বর মাসে তা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। এ বছর এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ৬৯৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ১ হাজার ২৭৯ জনই বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। গত এক মাসে মোট ৬৮৩ জন আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে বরগুনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন ডেঙ্গু রোগী এখানে চিকিৎসাধীন থাকায় শয্যার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বরগুনার হাসপাতালগুলোতে নতুন ৩৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত জেলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটেনি।

গত বছর প্রায় প্রতিটি ঘরে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ায় বরগুনা সদর উপজেলার ২নং গৌরীচন্না ইউনিয়নের দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামটি 'ডেঙ্গু কলোনী' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। সেই সময়ে এই এলাকার অন্তত ১০ জন বাসিন্দা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাস থেকে আবারও এই এলাকায় আশঙ্কাজনকভাবে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মশক নিধন কার্যক্রম এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের তোয়াক্কা করছে না প্রশাসন, যা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।

গৌরীচন্না ইউনিয়নের মনসাতলী গ্রামের বাসিন্দা কিরণ হাওলাদার বলেন, “এই গ্রামটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না থাকায় বিভিন্নস্থানে জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ কারণে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। এলাকার অনেকেই এবছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে মশক নিধন কার্যক্রম গ্রহণ করায় ডেঙ্গুর বিস্তার লাভ করছে।”

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রফিক জানান, তার স্ত্রীও সম্প্রতি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, “কিছু দিন আগে আমার স্ত্রী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে জ্বরের রোগী রয়েছে যাদের মধ্যে অধিকাংশই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। আমাদের ফুলতলা গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় না।”

অভিযোগ শুধু গৌরীচন্না ইউনিয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। বরগুনা জেলার ডেঙ্গু আক্রান্তদের একটি বড় অংশই বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। স্থানীয়দের দাবি, পৌর এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হলেও অধিকাংশ ইউনিয়নে চোখে পড়ার মতো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে জেলায় আবারও ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারের আশঙ্কা করছেন তারা।

এই বিষয়ে বরগুনা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানান, “ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য বরগুনার সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ল্ড চালু রয়েছে। এছাড়া জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ বছর ডেঙ্গু অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।”

অন্যদিকে, বরগুনা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বরগুনার সকল উপজেলায় প্রতি শনিবার একযোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। যার ফলে এখনো ডেঙ্গু গত বছরের মতো মহামারি আকার ধারণ করেনি।”