রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের একটি বিছানায় শুয়ে আছেন মাজহারুল ইসলাম। হাতে লাগানো ক্যানুলা আর পাশে বিমর্ষ মুখে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী লুৎফা আক্তার। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ছয় দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাজহারুল। আজ শনিবার তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও মনের দুশ্চিন্তা কমেনি। গত ১০ দিন ধরে তাঁর আয়ের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। তার ওপর মাথায় চেপে আছে পুরোনো ঋণের বিশাল বোঝা। তাই সুস্থ হয়ে দ্রুত বাড়ি ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনে। চিন্তিত কণ্ঠে মাজহারুল বলেন, ‘এহনই ২০ হাজার টেহা ঋণ করছি। আরও থাকলে কেমনে চলমু।’

দুই বছর আগে কিশোরগঞ্জ থেকে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন অটোচালক মাজহারুল ইসলাম। তিনি জানান, আগে কিশোরগঞ্জে মাছ চাষের পাশাপাশি রিকশা চালিয়ে জীবন অতিবাহিত করতেন। কিন্তু দুই বছর আগে এক ভয়াবহ বন্যায় তাঁর মাছের ঘের ভেসে যায় এবং পুঁজি সব হারিয়ে ফেলেন তিনি। পুনরায় মাছের ঘের তৈরির জন্য পরিচিতদের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা ধার করেন, কিন্তু সেই প্রচেষ্টাও লাভের মুখ দেখেনি। সব মিলিয়ে প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয় তাঁর।

সেই ঋণের বোঝা শোধ করার লক্ষ্যেই তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান এবং মিরপুর-১ নম্বরে বসতি গড়েন। সেখানে তিনি অটোরিকশা চালান এবং তাঁর সঙ্গে থাকেন স্ত্রী লুৎফা আক্তার। এই দম্পতির চার সন্তান রয়েছে, যাদের মধ্যে বড়জনের বয়স ১৩ বছর এবং ছোটজনের বয়স ৬ বছর। ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় চার সন্তানকেই গ্রামের বাড়িতে মাজহারুলের মায়ের কাছে রাখা হয়েছে।

গত শুক্রবার মাজহারুল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সবাইরে লইয়া থাকতে গেলে তো মেলা টাকা লাগে। খামু কী, ঋণ শোধ করব কেমনে।’

স্ত্রী লুৎফা আক্তার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত, যেখানে তাঁর মাসিক বেতন ১৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে মাজহারুল গড়ে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। দুজনের এই সম্মিলিত আয় দিয়ে তারা নিজেদের ভরণপোষণের পাশাপাশি গ্রামের ঋণ ধীরে ধীরে পরিশোধ করছেন এবং সন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠাচ্ছেন।

লুৎফা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘এভাবে আর পারি না। ঋণ শোধ হইতে আরও অন্তত এক বছর লাগব। এরপর বাড়ি যামু গা। বাচ্চাগো ছাড়া থাকতেও কষ্ট অয়।’

মাজহারুল ও লুৎফা জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর গত ছয় দিনে ওষুধ ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গিয়ে তাঁদের আবারও ২০ হাজার টাকা ধার করতে হয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর গত ১০ দিন ধরে মাজহারুলের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং স্বামীর পাশে থাকার জন্য লুৎফাও কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

এদিকে আজ রাজধানীর শিশু হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর উপচে পড়া ভিড়। শিশু হাসপাতালে বর্তমানে ৬২ জন রোগী ভর্তি আছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় বহির্বিভাগ থেকে আরও ৪৬টি শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে এবং নতুন করে ছয়টি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে।

শিশু হাসপাতালের আবাসিক সার্জন মাহমুদুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শিশু হাসপাতালে এখন হামের রোগী কিছুটা কমেছে। তবে ডেঙ্গু রোগী ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে ২৪৬টি শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়েছে। অক্টোবরে এখন পর্যন্ত ৯৯টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আজ শিশু হাসপাতালে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা হোসনেয়ারা বেগম তাঁর তিন বছর বয়সী শিশু আরিয়ানকে নিয়ে আসেন। তিন দিন ধরে আরিয়ানের জ্বর, তাই চিকিৎসকরা তাকে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছেন। হোসনেয়ারা বলেন, ‘আমি তো সচেতন ছিলাম। তবু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে বাচ্চাটা।’ তিনি আরও জানান, ‘আমার আশপাশের আরও কয়েকটি শিশু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। কীভাবে সুস্থ রাখব শিশুকে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ঘণ্টায় ১২০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।