ইংলিশ জায়ান্ট লিভারপুলের নিজস্ব মাঠে জয়লাভ করা বরাবরই কঠিন কাজ, আর সেখানে টানা দুটি লিগ ম্যাচে জয় পাওয়া যেকোনো দলের জন্যই অত্যন্ত কষ্টকর। ম্যানচেস্টার সিটির জন্য এই চ্যালেঞ্জটি ছিল আরও বেশি দুরূহ। ১৯৫৩ সালের পর এই কীর্তি আর করা সম্ভব হয়নি তাদের। অবশেষে দীর্ঘ ৭৩ বছরের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আনফিল্ডে ইতিহাস গড়ল এনজো মারেস্কার শিষ্যরা।

রোববার (১১ অক্টোবর) প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে লিভারপুলকে ৩-০ গোলে পরাজিত করেছে ম্যানচেস্টার সিটি। এই জয়ের মাধ্যমে প্রিমিয়ার লিগে টানা ছয় জয়ের দুর্দান্ত ধারা বজায় রাখল তারা। ম্যাচের প্রথম এক ঘণ্টা দুই দলের লড়াই সমান তালে চললেও ৬২ মিনিটে লিভারপুল মিডফিল্ডার রায়ান গ্রাভেনবার্খ লাল কার্ড দেখার পর ম্যাচের দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র ১৩ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি গোল করে স্বাগতিকদের মাঠেই উড়িয়ে দেয় সিটি। আর্লিং হলান্ড, জেরেমি ডকু এবং রায়ান শেরকি করেন দলের তিনটি গোল।

তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগে থেকেই আনফিল্ডে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে স্বাধীন কমিশনের রায়ের পর এটিই ছিল ম্যানচেস্টার সিটির প্রথম ম্যাচ। গ্যালারিতে উপস্থিত লিভারপুল সমর্থকেরা বিভিন্ন ব্যানার এবং দুয়োধ্বনির মাধ্যমে সিটি ক্লাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তবে মাঠের বাইরের এই মানসিক চাপ শেষ পর্যন্ত সিটির পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

ম্যাচের প্রারম্ভিক সময়ে স্বাগতিক লিভারপুল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে এগিয়ে ছিল। তবে দমিনিক সোবোসলাই, কোডি গাকপো এবং আলেক্সান্দার ইসাকের অনুপস্থিতিতে আক্রমণভাগে সুযোগ কাজে লাগাতে হিমশিম খেতে হয় আন্দোনি ইরাওলার দলের। প্রথমার্ধে ভিক্টর মুনিয়োস ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও গোল করতে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে, এনজো ফার্নান্দেজের একটি দূরপাল্লার শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন লিভারপুল গোলরক্ষক আলিসন বেকার।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও লিভারপুলের আক্রমণ বজায় ছিল। কৌমাস ও গ্রাভেনবার্খের প্রচেষ্টা রুখে দেন সিটি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা। ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপরই কৌশলগত পরিবর্তন আনেন কোচ মারেস্কা। ৫৬ মিনিটে ইলিমান এনদিয়ায়ের পরিবর্তে জেরেমি ডকুকে মাঠে নামান তিনি।

৬০ মিনিটে গোল করার দারুণ সুযোগ পান হলান্ড। আন্তোয়ান সেমেনিওর পাস থেকে আলিসনের সামনে প্রায় একা হয়ে পড়লেও নরওয়েজিয়ান ফরোয়ার্ডের শটটি পোস্টের বাইরে চলে যায়। ঠিক দুই মিনিট পরেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। ডকুকে ফাউল করার অপরাধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পান গ্রাভেনবার্খ। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এই ডাচ মিডফিল্ডারকে। রেফারি ক্রিস কাভানার এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে পরবর্তীতে বিতর্কও তৈরি হয়।

দশ জনের দলে পরিণত হওয়া লিভারপুলের বিপক্ষে বাড়তি খেলোয়াড়ের সুযোগ দ্রুত কাজে লাগায় সিটি। ৬৫ মিনিটে ডকুর শট ম্যাক অ্যালিস্টারের গায়ে লেগে ফিরে এলে সেই বল পেয়ে জোরালো শটে গোল করেন হলান্ড। এই গোলের মাধ্যমেই ম্যাচের গোলশূন্যতা ভেঙে যায়। এর মাত্র তিন মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ডকু। বাঁ প্রান্ত থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে দুর্দান্ত এক বাঁকানো শটে আলিসনকে পরাস্ত করেন এই বেলজিয়ান উইঙ্গার। বদলি হিসেবে নেমে প্রথমে আক্রমণের সূচনা করে এবং পরে নিজেও গোল করেন তিনি।

দুই গোল হজম করার পর লিভারপুল ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও সিটির আক্রমণ সামলাতেই তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। অবশেষে ৭৮ মিনিটে আরও একটি দৃষ্টিনন্দন গোল করে স্বাগতিকদের শেষ আশাটুকুও মুছে দেন শেরকি।

এই ৩-০ গোলের জয়ের মাধ্যমে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারির পর প্রথমবার লিভারপুলের মাঠে টানা দুটি লিগ ম্যাচ জেতার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ল ম্যানচেস্টার সিটি। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আনফিল্ডে ২-১ গোলে জিতেছিল তারা, যেখানে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে হলান্ডের পেনাল্টি গোলে জয় পেয়েছিল সিটি।