আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের লামা উপজেলায় বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে এখন প্যান্ডেল নির্মাণ, প্রতিমা সাজসজ্জা এবং আলোকসজ্জার প্রস্তুতিতে ব্যস্ততা চলছে।
সাধারণত প্রতিবছর এই উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নের মোট আটটি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে এবার উৎসবের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং ১০টি মণ্ডপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এসব পূজামণ্ডপে কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিমাগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত করা হয়েছে।
এবারের পূজার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে কেন্দ্রীয় হরি মন্দির মণ্ডপে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আয়োজন করা হয়েছে ‘মায়ের আরতি প্রতিযোগিতা’। এছাড়া এখানে নাটিকা, মাতৃসাজ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান also অনুষ্ঠিত হবে। দুর্গাপূজার পুরো আয়োজন যেন নির্বিঘ্ন থাকে, সে লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে পৌরসভা এলাকা ও উপজেলার বেশ কিছু পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে যে, কাদা-মাটি, বাঁশ, খড় ও সুতলি ব্যবহার করে শৈল্পিক ছোঁয়ায় দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য দেবদেবীর প্রতিমাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেয়েছে। প্রতিমাগুলোতে রংতুলির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে কারিগরেরা প্রতিমা সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। প্রতিটি মণ্ডপে প্রতিমাশিল্পীদের নিপুণ আঁচড়ে তৈরি হচ্ছে অনন্য সব প্রতিমা। গভীর ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সাথে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা।
প্রতিমা তৈরির শিল্পী সমীর পার জানান, প্রতিমা গড়া ও রংতুলির কাজ শেষ। এখন শুধু সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমাগুলোকে ফুটিয়ে তোলার কাজ চলছে। ১৪ অক্টোবরের মধ্যে মণ্ডপ কমিটির কাছে প্রতিমা বুঝিয়ে দিতে হবে।
এদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে কেনাকাটার বাজারেও। পূজা উপলক্ষে কাপড়ের দোকানগুলোতে ভিড় করছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষেরা। লামা পৌর শহরের নিউ মার্কেট থেকে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী পূজা রাণী দত্ত বলেন, ‘দুর্গাপূজা মানেই আনন্দ, আর আনন্দের শুরু হয় নতুন পোশাক দিয়ে। সন্তানদের জন্য শাড়ি, পাঞ্জাবি আর ছোটদের জামা কিনেছি। গতবারের চেয়ে এবার দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে, তবে উৎসব বলে না কিনে উপায় নেই।’
আরেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী অলক কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা। যা সাধারণত বাংলা আশ্বিন বা কার্তিক মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হয়।’
লামা কেন্দ্রীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি গোপন কান্তি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক বিধান কান্তি দাশ একসুরে বলেন, আশা করি সকলে মিলেমিশে এ উৎসব উদ্যাপন করতে পারব। এবার তাদের মণ্ডপে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হবে। তারা আরও জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও পূজার জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি মণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে খাদ্যশস্য সহায়তা পেয়েছেন। তবে তারা এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ পাননি।
একই কথা জানিয়েছেন ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা দুর্গা মন্দির মণ্ডপ, পূর্ব হায়দারনাশী সৎসঙ্গ মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার সার্বজনীন শ্রী শ্রী হরি মন্দির ও শ্রী শ্রী জগন্নাথ আশ্রম পূজামণ্ডপ, পাগলির আগা, আজিজনগর ইউনিয়নের তেলুনিয়া, মেরাখোলা ও পৌরসভার চম্পাতলী মণ্ডপ কমিটির সদস্যরা।
মেরাখোলা মণ্ডপ কমিটির সভাপতি সাগর জানান, তাদের মণ্ডপের সব প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে এবং সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। ১৪ অক্টোবর বিকেলের মধ্যে সব সাজসজ্জার কাজ শেষ হবে। প্রতিবছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপন করতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা। এবার মেরাখোলা হরি মন্দির মণ্ডপে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।
সার্বজনীন লামা উপজেলা কেন্দ্রীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি প্রশান্ত ভট্টাচার্য জানান, এবার লামা পৌরসভা এলাকায় দুটি, লামা সদর ইউনিয়নে একটি, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে পাঁচটি, আজিজনগর ইউনিয়নে একটি ও ফাইতং ইউনিয়নে একটি মণ্ডপে পূজা উদ্যাপিত হবে। পূজার সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পূজা সফলভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার সহযোগিতার কামনা করেন তিনি।
লামা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কাইছার হামিদ জানান, পূজা উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মণ্ডপে পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবকেরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া প্রতিটি মন্দিরে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। প্রতিবছরের মতো এবারও সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এ ধর্মীয় উৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যান্য বছরের মতো এবারও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে পালনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইতিমধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি মণ্ডপে বরাদ্দের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।