একসময় শিশুদের কলকাকলিতে মুখর থাকত এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। প্রতিদিন সকালে বই-খাতা হাতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা এখানে ছুটে আসত। শ্রেণিকক্ষে চলত পাঠদান, আর বিরতির সময়ে মাঠজুড়ে দেখা যেত শিশুদের দৌড়ঝাঁপের দৃশ্য। দেয়ালের ছবি আর শিক্ষার্থীদের ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলো যেন এখনও সেই সোনালি দিনগুলোর সাক্ষ্য বহন করছে।

তবে সেই প্রাণবন্ত চিত্র এখন কেবলই অতীত। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলোতে এখন জমেছে ধুলোর আস্তরণ। কোথাও পড়ে আছে পুরোনো বই-খাতা, কোথাও শিক্ষার্থীদের ফেলে যাওয়া শিক্ষা উপকরণ। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত বই-খাতাও এখনও পড়ে আছে শ্রেণিকক্ষে। দরজা-জানালা পেরিয়ে এক গভীর নীরবতা যেন পুরো বিদ্যালয়টিকে গ্রাস করেছে।

দৃশ্য দেখে মনে হয়, এই বুঝি আবার বই-খাতা হাতে ছুটে আসবে শিশুরা, শিক্ষক এসে ডাকবেন এবং শুরু হবে পাঠদান। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এই বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিতে না পারা, তীব্র শিক্ষকসংকট এবং পরিচালনার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে সম্ভাবনাময় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এটি বান্দরবানের লামা উপজেলার ২ নম্বর সদর ইউনিয়নের মিরিঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মিরিঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি পাড়ার শিশুদের জন্য এই বিদ্যালয়টি ছিল প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল।

দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে স্থানীয় অনেক পরিবারের সন্তানই এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল সন্তোষজনক। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং দুর্গম এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তে নানা সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি স্থবির হয়ে যায়।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই মহৎ উদ্দেশ্যে আনোয়ার আলীর স্ত্রী জায়তুল নেছা জুতি প্রায় ৪০ শতক জমি দান করেন। এরপর ২০০২ সালে লামা লাইনঝিরি হুসেন স্যার, জায়তুল নেছা জুতি, নেজাম উদ্দিন ও মো. জিয়াবুলের যৌথ উদ্যোগে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আশপাশের কয়েকটি পাড়ার শিশুদের জন্য বিদ্যালয়টি শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের অনেকেই এখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের কয়েকজন পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার বাহিনীতেও কর্মরত হয়েছেন। তাদের মধ্যে লাংরি ম্রো, ইয়ুংনম ম্রো, কুংলাই ম্রো ও সাকরই ম্রোসহ কয়েকজন বর্তমানে বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান।

তবে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চরম অর্থনৈতিক সংকট। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাসিক বেতন হিসেবে মাত্র ২ হাজার টাকা করে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে সেই সামান্য বেতনটুকুও নিয়মিত পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে শিক্ষকদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শিক্ষকসংকট তীব্র আকার ধারণ করে। শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

বিদ্যালয়টি সচল রাখার জন্য পরবর্তী সময়ে জাগো ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানান। এতে কিছু সময়ের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হলেও একজন শিক্ষকের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে পুরো বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষকসংকট ও আর্থিক সমস্যার কারণে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। যে বেঞ্চগুলোতে প্রতিদিন বসত শিশুদের সারি, সেগুলো এখন ধুলায় ঢাকা। শ্রেণিকক্ষের এক কোণে পড়ে আছে পুরোনো বই-খাতা। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়জুড়ে বিরাজ করছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। দেয়ালে এখনো শিশুদের স্মৃতি বহনকারী বিভিন্ন উপকরণ দেখা যায়। এসব দেখে বোঝার উপায় নেই যে, একসময় এই শ্রেণিকক্ষগুলোতে প্রতিদিন পাঠদান হতো এবং শিশুরা আনন্দে সময় কাটাত।

স্থানীয়দের কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, বিদ্যালয়টি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু একটি ভবনই নীরব হয়নি; নীরব হয়ে গেছে দুর্গম এলাকার অনেক শিশুর শিক্ষাজীবনও। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিরিঞ্জা বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে দুর্গম এলাকার শিশুরা। অনেক পাড়া থেকে অন্য বিদ্যালয়ে যেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। পাহাড়ি দুর্গম পথ, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সব শিশুর পক্ষে দূরের বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করা সম্ভব হয় না। ফলে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছু শিশু অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অনেকের পড়াশোনা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। কারও কারও শিক্ষাজীবনও পুরোপুরি থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, মিরিঞ্জা বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু করা গেলে দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ের উপস্থিতি থাকলে ঝরে পড়ার হারও কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদেরও দাবি, দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হোক। তাদের মতে, একটি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু বর্তমান কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে একটি এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। যে বিদ্যালয় থেকে একসময় অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, সেই বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করেন তারা।

বিদ্যালয়ের তৎকালীন সভাপতি চাকনাই ম্রো বলেন, “প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকে বিদ্যালয়টি ছিল প্রাণবন্ত। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে নিয়মিত পাঠদান হতো। পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো ছিল।” তিনি আরও বলেন, “এ বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বিদ্যালয়টি আবার চালু হলে নতুন প্রজন্মের শিশুরাও এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।”

৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. জিয়াবুল বলেন, “মিরিঞ্জাসহ আশপাশের দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য বিদ্যালয়টির গুরুত্ব রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়টি পুনরায় চালু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এলাকার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার প্রসার ও নিরক্ষরতা কমাতেও বিদ্যালয়টি ভূমিকা রাখতে পারে।” তার মতে, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সহযোগিতা পাওয়া গেলে বিদ্যালয়টি আবারও চালু করা সম্ভব।

লামা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দেবাশিস বিশ্বাস বলেন, “বিদ্যালয়টি প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।” তিনি জানান, বিদ্যালয়টি পরিচালনার জন্য কার্যকর ও দায়িত্বশীল উদ্যোক্তার অভাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বিদ্যালয়টির পরিচালনা ও শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, “সরকারি সহায়তা বা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে এ পর্যন্ত কেউ উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করেননি।”