ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে বই-খাতা নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে শুরু করেন অথোয়ই মারমা। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিদিন তিনি পৌঁছান বান্দরবানের লামা উপজেলার বনপুর রাজাপাড়ায়। সেখানে তার অপেক্ষায় থাকে পাহাড়ের একদল উৎসুক শিশু। যাদের অনেকের কাছেই মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ এখনো সহজলভ্য নয়।

২০২৩ সাল থেকে বনপুর সাংগু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করছেন অথোয়ই মারমা। প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। বিকেল ৩টা পর্যন্ত ক্লাস নেওয়ার পর পুনরায় সেই দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে বাড়ি ফেরেন তিনি। পরদিন আবারও একই পথ, একই দায়িত্ব—এভাবেই চলে তার জীবন।

শিক্ষকতার এই মহান দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে মাস শেষে তিনি পান মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানো তো দূর কথা, মা-বাবার খরচ চালাতেও তাকে হিমশিম খেতে হয়। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষকতা পেশা ছাড়েননি অথোয়ই।

অথোয়ই মারমার বেড়ে ওঠার গল্পটি ছিল নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। তিনি লামা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ত্রিশড্রেবা পাড়ার বাসিন্দা। বাবা ক্যচিং মারমা ও মা চোছা মারমার তৃতীয় সন্তান তিনি।

শৈশবে রামতুইপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন অথোয়ই। তবে পরিবারের চরম আর্থিক সংকটের কারণে তাকে নিজ এলাকা ছেড়ে কুমিল্লার জ্যোতিঃপাল মহাথের বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। তার শৈশবের একটি বড় সময় সেখানেই অতিবাহিত হয়।

দারিদ্র্য তাকে শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারেনি। কঠোর পরিশ্রমে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৩৯ এবং ডুলাহাজারা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ২.৩৩ অর্জন করেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক বোঝা হালকা করতে রাবার বাগানে গাছ কাটার কাজ করেছেন তিনি, এমনকি কৃষিশ্রমিক হিসেবেও কাজ করেছেন।

এক সময়ে সংসারের তীব্র টানাপোড়েনের কারণে বাবা তাকে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

তবে পড়াশোনা ছাড়তে রাজি হননি অথোয়ই। তিনি বাবাকে বলেছিলেন, “পড়ালেখা না করলে জঙ্গলে যেমন বন আর প্রাণীরা নিজেদের মতো চলে, আমাদের জীবনও তেমন হয়ে যাবে। আমার পড়ালেখা করতে হবে। আমি মানুষের মতো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করব।” পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সেই অদম্য জেদই তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

অথোয়ই নিজের জীবনের সংকটগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তবে সেই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাকে পাহাড়ের শিশুদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করে তুলেছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি শিশুর স্কুলে যাওয়া কতটা কষ্টসাধ্য, তা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দারিদ্র্যের কারণে কখন একটি শিশু বই-খাতা ছেড়ে শ্রমে নিযুক্ত হয়, তা তার অজানা নয়। পরিবারের আর্থিক সংকটে কত স্বপ্ন মাঝপথে থেমে যায়, সেই অভিজ্ঞতা তার নিজেরই।

তাই তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়া শেখান না, বরং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা দেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তাদের বোঝান যে, দারিদ্র্য কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে না। সঠিক সুযোগ পেলে পাহাড়ের শিশুরাও সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।

অথোয়ই মারমার জীবনের সবচেয়ে বড় কঠিন বাস্তবতা হলো তার পারিশ্রমিক। মাস শেষে কখনো তিনি পান ৫০০ টাকা, আবার কখনো ১ হাজার টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়ে যাতায়াত, ব্যক্তিগত প্রয়োজন কিংবা পরিবারের ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব।

নিজের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অথোয়ই মারমা বলেন, “মাস শেষে কখনো ৫০০ টাকা, আবার কখনো ১ হাজার টাকা পাই। এই সামান্য আয় দিয়ে মা-বাবার খরচ চালাতেও হিমশিম খেতে হয়।”

সংসারের খরচ মেলাতে তাকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তার এলাকার অনেক মানুষও একইভাবে কষ্টের জীবনযাপন করছেন। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করেন।

বনপুর সাংগু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, “বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে শিক্ষকরা সংসার চালাতে বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। কেউ গরুর খামারে কাজ করেন, আবার কেউ বাগানে শ্রম দেন।”