মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে পুনরায় পুরোদমে সামরিক হামলা চালানোর বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী সেখানে বড় ধরনের অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা।
পেন্টাগন পরিকল্পনা করেছে যে, খুব শীঘ্রই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করা হবে। এই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, জ্বালানি স্থাপনা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নীল নকশা তৈরি করেছে পেন্টাগন।
তবে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার বিষয়ে ট্রাম্প একাধিকবার পিছিয়ে এসেছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেলের ট্যাংকারে ইরানের হামলা বৃদ্ধি পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল সীমিত। গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, “নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবেন না তিনি।” একই পোস্টে তিনি দুই দেশের মধ্যে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে বলেও উল্লেখ করেছেন।
গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান আরও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। দেশটির সামরিক কৌশলের উন্নতির ফলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে এমনিতেই চাপের মুখে থাকা মার্কিন অস্ত্রের মজুত আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে ইরান কিংবা ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পাঁচটি প্রস্তাব ট্রাম্পের কাছে পেশ করেছিল তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দল ও পেন্টাগন। তবে প্রতিবারই তিনি সেই প্রস্তাবগুলো নাকচ করে দিয়েছেন।
তা সত্ত্বেও এবার নতুন করে হামলার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সম্ভাব্য অভিযান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এই অভিযানের লক্ষ্য হবে স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র হামলা চালানো। এই অভিযানটি প্রায় তিন দিন স্থায়ী হতে পারে।
এই অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুতকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এসব অস্ত্রের মজুত অনেকটাই পুনরায় তৈরি করে নিয়েছে। এছাড়া ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ড পোস্ট ও সদর দপ্তরেও হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এর আগে নতুন এই পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হচ্ছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তার ভিত্তিহীন নয়। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধের কারণে আলোচনা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, প্রথমেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তি হোক; কিন্তু ইরানের আলোচকেরা বলছেন, এ বিষয়ে আলোচনা হতে হবে সবার শেষে।
এদিকে গত কয়েক মাসে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। দেশটির সামরিক কৌশল উন্নত হওয়ায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের তুলনায় বেশি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে এমনিতেই চাপের মুখে থাকা মার্কিন অস্ত্রের মজুত আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, চীনা কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা স্যাটেলাইটের ছবি কাজে লাগিয়ে ইরান এখন আরও নিখুঁতভাবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে। এরপর থেকে ইরান অন্তত ১৩টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে হামলার সংখ্যা প্রায় ২০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার জবাবে বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়লেও ইরানের হামলা জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ভবিষ্যতে এ অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। গ্রীষ্মজুড়ে আন্তর্জাতিক জলপথ ও জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে নিয়মিত পাল্টা হামলা চালিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রতিক্রিয়া অনেকটাই কমে এসেছে। কর্মকর্তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে ট্রাম্পের দ্বিধার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোয় ইরানের হামলা ঠেকানোও ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে। গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেছেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা কোনো তেলই ইরানের নয়।” তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা এ দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ইরান কিছু জাহাজকে ফি নেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেয়। এসব জাহাজের কোনো কোনোটি ইরানের তেলও বহন করে থাকতে পারে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের নিজস্ব একটি গোপন ট্যাংকারবহর রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহন করে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি পেতে চীনা কোম্পানিগুলোও ইরানকে ফি দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান দীর্ঘদিন ধরে গোপনে নিজেদের তেলের সঙ্গে ইরাকের তেল মিশিয়ে রপ্তানি করে আসছে। ইরানের তেল চোরাচালানে ব্যবহৃত গোপন ট্যাংকারবহরের অংশ বলে দাবি করে গতকাল ১৭টি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
ইরানে আবার সামরিক অভিযান শুরু করলে দেশটির কৌশল বা পরিকল্পনায় আদৌ পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের অনেকেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ বড় ধরনের পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে। এরপর থেকে ইরান অন্তত ১৩টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ নৌবাহিনী পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা। এসব হামলার জবাবে বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রশাসনের কেউ কেউ মনে করছেন, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল কাজে দিয়েছে। তেহরানকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করতে এই চাপ অব্যাহত রেখে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো হবে না বলে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগেই কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, তিনি নির্বাচনের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁদের অনুমান ছিল, ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচন এবং এর পরের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর হামলার বিষয়টি বিবেচনা করবেন তিনি।
তবে ট্রাম্প নিজের এই অবস্থান থেকে সরে এলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা। চলতি মাসের শেষ দিকে সমুদ্রে ২০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন সেনা এবং শত শত উড়োজাহাজ থাকবে। তবে এত বিপুল সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
গত সপ্তাহে সান দিয়েগো ছেড়েছে বিমানবাহী রণতরি থিওডর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন নৌবহর। অক্টোবরের শেষ দিকে এটি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ওয়াশিংটন নামের বিমানবাহী আরও দুটি রণতরির সঙ্গে যোগ দেবে। প্রতিটি রণতরির সঙ্গে রয়েছে অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ। রণতরীর বহরে আরও আছে হামলাকারী হেলিকপ্টার ও মেরিন সেনা। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি অবস্থান করবে।
চলতি মাসের শেষ দিকে সমুদ্রে ২০ হাজারের বেশি নাবিক ও মেরিন সেনা এবং শত শত উড়োজাহাজ থাকবে। তবে এত বিপুল সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। রুজভেল্ট আগামী মাসে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কিছুদিন পর জর্জ ওয়াশিংটনকে জাপানে তার ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
এত সামরিক শক্তি জড়ো করা হলেও নির্বাচনের পর ট্রাম্প নতুন করে হামলার অনুমতি দেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো রক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের বৈশ্বিক মজুত আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা। ইরানের হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে সামরিক অভিযান আবার শুরু করার পক্ষে থাকা কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের অর্থনীতি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে তীব্র হামলা চালালে তেহরানের সংকট আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইরান আরও চাপে পড়বে বলে ধারণা করছেন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সাধারণত দুটি করে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ত মার্কিন সামরিক বাহিনী। সে সময় সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক ঠেকানোর ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু ইরানের সামরিক কৌশল ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি বদলেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরানের ছোড়া একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা ঠেকাতে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের আরও বেশি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মার্কিন কমান্ডারদের দাবি, যুদ্ধের কারণে অস্ত্রের মজুত কমে এলেও তাঁদের হাতে এখনো পর্যাপ্ত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইউরোপ ও এশিয়া থেকেও অস্ত্রশস্ত্র এনে মজুত বাড়িয়েছে।