আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত ও প্রাচীন প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিঙ্গার থেকে প্রকাশিত হয়েছে রাজশাহী কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. সাজেদুল ইসলামের লেখা একটি বই। বইটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘হাইড্রোকেমিক্যাল ইভাল্যুয়েশন অ্যান্ড গ্রাউন্ডওয়াটার কোয়ালিটি’। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে ই-বুক এবং হার্ড কপি আকারে এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

বইটির প্রকাশনা প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত আন্তর্জাতিক। এর পর্যালোচনা বা রিভিউ সম্পন্ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, প্রুফ রিডিং বা ভুল সংশোধন করা হয়েছে ভারতে। বইটির বাঁধাই ও মুদ্রণ কাজ হয়েছে নেদারল্যান্ডসে এবং প্রকাশনা হয়েছে সুইজারল্যান্ড থেকে। বর্তমানে ফ্রান্স থেকে এর বিপণন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আর বিক্রয় ও বিপণনের দায়িত্ব পালন করছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজন ও কিন্ডল লাইব্রেরি। বইটির দাম রাখা হয়েছে ১৩০ ইউরো, যা ভ্যাট ও শুল্কসহ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজার টাকা। এছাড়া বইটি ডাউনলোড করতে খরচ হয় ১১১ দশমিক ২৭ ইউরো।

অধ্যাপক সাজেদুল ইসলাম জানান, এর আগেও স্প্রিঙ্গার থেকে বাংলাদেশি লেখকদের বই প্রকাশিত হয়েছে, তবে এককভাবে লেখা বইয়ের ক্ষেত্রে তাঁরটিই প্রথম। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বইটি প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, সরকার সম্প্রতি সাজেদুল ইসলামকে ‘জাতীয় গুণী শিক্ষক’-এর মর্যাদা প্রদান করেছে।

বইটি লিখতে তাঁর সময় লেগেছে ছয় থেকে সাত মাস, তবে রিভিউ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে আরও প্রায় এক বছর ব্যয় হয়েছে। ভূ-রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে জলস্তরের ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তনের কৌশল ও মাত্রার বিষয়ে গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই বইয়ে।

অধ্যাপক সাজেদুল ইসলাম বইটিতে জলস্তরে খনিজ-পানির সম্ভাব্য মিথস্ক্রিয়ার কৌশল, পানিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর সংমিশ্রণ, তাপগতীয় ব্যাখ্যা, জলস্তরে দ্রবীভূত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের প্রভাব, পানিদূষণের উৎস, প্রাকৃতিক নিয়ামকের প্রভাবের ধরন এবং আইসোটোপ লঘূকরণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করেছেন। বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে ভূ-রসায়ন, ভূতাত্ত্বিক জলস্তর ও ভূগর্ভস্থ পানির গুণাগুণ এবং ব্যবহার উপযোগিতা নিয়ে কাজ করা গবেষকদের জন্য এই বইটি অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বইয়ের একটি বিশেষ অধ্যায় সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো প্রাণী পানি পান করে। পানি ছাড়া আরও প্রায় ৩০ রকম খনিজ উপাদান গ্রহণ করার জন্য আমরা পানি পান করি। এগুলো অন্য কোনো খাবার থেকে সহজে পাওয়া যায় না। তবে এসব উপাদানের নির্দিষ্ট মাত্রা আছে। মাত্রার বেশি হলে সেটি শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। যেমন: ভূগর্ভস্থ পানিতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা প্রতি লিটারে ৭৫ মিলিগ্রামের বেশি থাকা উচিত নয়। কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলসহ পৃথিবীর অনেক স্থানের পানিতে এর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ক্যালসিয়াম শনাক্ত হয়েছে। আমার বইয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পানির গুণাগুণ পরিমাপ ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আলাদা একটি অধ্যায় আছে।’

অধ্যাপক সাজেদুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং ওই ইনস্টিটিউটের পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশ, ভূগর্ভস্থ পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। তাঁর রচিত অন্তত ৩৫টি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে উপস্থাপন করেছেন তিনি। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহ গ্রামে তাঁর জন্ম।

স্প্রিঙ্গারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশে স্প্রিঙ্গারের একটি করে কার্যালয় আছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের কার্যালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলাম। প্রথমে অনলাইনে প্রায় ২০ পৃষ্ঠার একটা ফরম পূরণ করতে হয়। তারা এটা দেখে নির্ণয় করে এই কনটেন্ট কত বছর চলতে পারে, কী পরিমাণ মুনাফা হতে পারে। সব যাচাই করে সন্তুষ্ট হলে তারা লেখার জন্য অনুমতি দেয়। তারপর ৩০ পৃষ্ঠার একটি চুক্তিপত্র সই হয়। সাইনিং মানি হিসেবে দেওয়া হয় এক হাজার ডলার।’

অধ্যাপক সাজেদুল ইসলাম মনে করেন, দেশে বসে যদি বিদেশ থেকে একটি ডলারও আয় করা যায়, সেটিই তাঁর সার্থকতা।