বরেন্দ্র অঞ্চলখ্যাত নওগাঁয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নামছে। সাম্প্রতিক দুই বছরে পানির স্তর প্রায় ১ দশমিক ৯৫ মিটার নিচে নেমে যাওয়ায় এলাকায় খাবার পানি ও সেচের সংকট তীব্র হচ্ছে। একসময় ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতায় সহজে পানি পাওয়া গেলেও, বর্তমানে অনেক এলাকায় ৩৫০ থেকে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত বোরিং করতে হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির সংকট বাড়ার পাশাপাশি সেচের আওতা কমছে, যা কৃষকের ব্যয় বাড়িয়ে লাভ কমিয়ে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। কিন্তু দুই বছর পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ০৪ মিটারে। অর্থাৎ, এই সময়ে পানির স্তর প্রায় ১ দশমিক ৯৫ মিটার নিচে নেমেছে।
নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার, পত্নীতলা ও মহাদেবপুর উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সংকট কৃষি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রাকৃতিক উষ্ণতা ও খরাপ্রবণতার কারণে এসব এলাকায় ফসল রক্ষায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকলেও, পানির স্তর নিচে নামায় সেচ সুবিধা হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক ও গভীর নলকূপের অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় একটি গভীর নলকূপ দিয়ে ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হলেও, এখন অনেক এলাকায় তা কমে ৯০ থেকে ১১০ বিঘায় দাঁড়িয়েছে। ফলে সেচের খরচ বাড়ছে এবং কৃষকের লাভ কমছে।
নিয়ামতপুরের গভীর নলকূপের অপারেটর মোহাম্মদ মস্তফা বলেন, "দিন দিন গভীর নলকূপে পানি ওঠা কমে যাচ্ছে। দুই বছর আগেও যে পরিমাণ পানি পাওয়া যেত, এখন তার তুলনায় অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। অথচ পানি তুলতে খরচ বেড়েছে।"
পোরশা উপজেলার গভীর নলকূপের অপারেটর ও কৃষক মো. সাজ্জু জানান, পানি সংকটের কারণে এলাকায় এখন গম ও আমের আবাদ বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, "কয়েক বছর আগেও ১১০ থেকে ১২০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যেত। এখন ৩৫০ থেকে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত গভীর নলকূপের বোরিং করতে হচ্ছে। শুধু সেচ নয়, খাবার পানির সংকটও প্রকট হচ্ছে।"
পোরশার কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, "শুকনো মৌসুমে টিউবওয়েল চেপেও অনেক সময় খাবার পানি পাওয়া যায় না। তখন পুকুর বা জলাশয় থেকে পানি এনে প্রয়োজন মেটাতে হয়।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন, নদী-নালা ও খাল-বিলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং জলাধারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসাধারণ সম্পাদক নাইস পারভীন বলেন, পানির সংকট উত্তরণে কৃষিকাজে পানির ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি নদী-নালা ও খাল-বিল খনন করে পানির প্রবাহ ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা বিবেচনায় কৃষি খাতে প্রান্তিক পর্যায়ে আবাদসংক্রান্ত পরামর্শ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলে অতীতে এলোমেলোভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর থেকে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ রাখা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় পুকুর ও জলাশয় খনন করে পানি ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি পানি ব্যবহারে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরোনো জলাশয় পুনঃখনন ও সেচের পানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নওগাঁর উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কৃষি ও মানুষের জীবন—দুই ক্ষেত্রেই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির ভবিষ্যৎ। একদিকে যত গভীরে যাচ্ছে নলকূপ, অন্যদিকে ততই কমছে পানির প্রাপ্যতা। তিনি আরও বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর পাশাপাশি আমন ও বোরো মৌসুমে গম, আম ও সবজি চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আত্রাই, ছোট যমুনা ও পূর্ণভবা নদীর বর্ষার পানি ধরে রাখতে পারলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।