চট্টগ্রাম নগরের উত্তর পতেঙ্গার হাউজিং কলোনি রোডের একটি চারতলা ভবনে ছয়টি পরিবারের বসবাস। এই এলাকায় চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি পৌঁছায় না। ফলে পানির প্রয়োজনীয়তা মেটাতে ভবনের মালিক মোহাম্মদ সায়েম প্রায় ১২০ ফুট গভীর একটি নলকূপ বসিয়েছেন। তবে সেই পানিও ব্যবহারের অনুপযুক্ত। সায়েম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নলকূপ থেকে ঘোলা ও লবণাক্ত পানি ওঠে। পান ও রান্নার জন্য জারের পানি কিনতে হয়। পানির বড় কষ্টে আছি। এলাকার সবার একই অবস্থা।’
কেবল উত্তর পতেঙ্গাই নয়, বরং উত্তর ও দক্ষিণ পতেঙ্গা এবং কাটগড়সহ নগরের মোট ১০টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যে, নলকূপের পানি নিয়ে বাসিন্দাদের একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পানি লবণাক্ত, আবার কোথাও ঘোলা বা লালচে রঙের। এই সংকটের কারণে অনেক পরিবার পানীয় ও রান্নার পানির জন্য বাজার থেকে জারের পানি কিনে ব্যবহার করছে।
বাসিন্দাদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় চট্টগ্রামের ভূগর্ভস্থ পানিতে বিভিন্ন ধাতুর দূষণের উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক নমুনায় আয়রন, ম্যাংগানিজ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা খাবার পানির জন্য নির্ধারিত নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অগভীর নলকূপগুলোতে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি হলেও গভীর নলকূপের পানি সব ক্ষেত্রে নিরাপদ প্রমাণিত হয়নি।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় গভীর নলকূপেও অতিরিক্ত আয়রন পাওয়া যায়। কোনো কোনো জায়গায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট গভীর নলকূপের পানিতেও আয়রনের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। তাই নলকূপ গভীর হলেই পানি নিরাপদ হবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পানিতে কী উপাদান কত মাত্রায় আছে, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।’
এ বছরের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ক্লিনার ওয়াটার’-এ সর্বশেষ একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুরে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে চট্টগ্রামের পানির মানের ব্যাপক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রায় ৫০টি গভীর নলকূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় চার কোটি লিটার পানি তোলার সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত গভীর নলকূপ রয়েছে আরও প্রায় ৪ হাজার ২০০টি। তবে ওয়াসার কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়াই বসানো গভীর নলকূপের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। অর্থাৎ, এই শহরের পানির প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে নলকূপ।
শুষ্ক মৌসুমে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হাসানসহ আটজন গবেষক ক্লিনার ওয়াটারে প্রকাশিত এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন। তারা চার জেলার ১০১টি নলকূপ থেকে শুষ্ক ও বর্ষা—উভয় মৌসুমের নমুনা সংগ্রহ করেন। এসব নমুনায় অ্যালুমিনিয়াম, তামা, আয়রন, ম্যাংগানিজ, ক্রোমিয়াম ও আর্সেনিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে, বর্ষাকালের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে পানির মান অনেক বেশি খারাপ। কিছু নমুনায় আর্সেনিক ও ম্যাংগানিজের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আয়রনের ক্ষেত্রেও উভয় মৌসুমেই সীমা অতিক্রম করার ঘটনা পাওয়া গেছে। একাধিক ধাতুর উপস্থিতির ভিত্তিতে দূষণের মাত্রা হিসাব করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুরের অবস্থা তুলনামূলক খারাপ। তবে গবেষণায় এমন ফল পাওয়া যায়নি যে চট্টগ্রামের সব নলকূপের পানিই দূষিত।
গবেষক মাহমুদুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে জানান, চট্টগ্রামের ভূতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত জটিল। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন পানির মান খারাপ হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শুষ্ক মৌসুমে পানি উত্তোলনের হার বাড়লে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায় এবং ভূগর্ভের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে। তাঁর ভাষ্যমতে, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারির নমুনায় ম্যাংগানিজ, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বোয়ালখালীর কয়েকটি নলকূপে এসব ধাতুর মাত্রা বেশি ছিল।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘হেলিয়ন’-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় চট্টগ্রাম নগরের আরও বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের ১১৭টি নলকূপের পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৫৯টি বা প্রায় ৫০ শতাংশ নমুনায় আয়রন এবং ৭৪টি বা ৬৩ শতাংশ নমুনায় ম্যাংগানিজের মাত্রা বাংলাদেশের খাবার পানির নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছিল।
কাট্টলী, পাহাড়তলী ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় আয়রন ও ম্যাংগানিজের আধিক্য বেশি পাওয়া গেছে। বন্দর ও ডবলমুরিং এলাকার অগভীর স্তরের কিছু নমুনায় আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে ১১৭টি নমুনার মধ্যে মাত্র একটিতে আর্সেনিক নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছিল, যা পাওয়া গেছে উত্তর পতেঙ্গার একটি মাঝারি গভীরতার নলকূপে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০টি অগভীর নলকূপের ৬৬ শতাংশ নমুনায় আয়রন এবং ৮১ শতাংশে ম্যাংগানিজ সীমার বেশি ছিল। তবে ৩০০ ফুটের বেশি গভীর নলকূপের কিছু নমুনাতেও এই দুই ধাতু সীমা ছাড়িয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে উচ্চ ঝুঁকি
২০২৫ সালে ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। শিল্পাঞ্চলের ৩৪টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও সিসাকে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একাধিক ধাতুর সম্মিলিত দূষণ মাপার সূচকে ৫৩ শতাংশের বেশি নমুনা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলের দক্ষিণ অংশে দূষণ বেশি ছিল। গবেষকেরা শিল্পকারখানার কার্যক্রম ও বর্জ্যকে এই দূষণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আলোচনা করেছেন, যদিও কোন কারখানার বর্জ্যে কোন নির্দিষ্ট নলকূপ দূষিত হয়েছে, তা গবেষণায় প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
তিনটি গবেষণাতেই পানিতে পাওয়া ধাতুর ভিত্তিতে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির হিসাব করা হয়েছে। সর্বশেষ গবেষণায় আর্সেনিক ও ম্যাংগানিজের কারণে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি দেখা গেছে।
গভীর নলকূপই কি সমাধান?
চট্টগ্রামে ওয়াসার নিজস্ব নলকূপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বাড়ি, আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় বিপুল সংখ্যক নলকূপ রয়েছে। ওয়াসা নতুন করে আরও অন্তত ৮৭টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। তবে মাহমুদুল হাসান বলেন, চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও সামুদ্রিক—উভয় ধরনের অঞ্চল রয়েছে। তাই সামগ্রিক গবেষণা ছাড়া কেবল গভীর নলকূপ বসালেই নিরাপদ পানি পাওয়া যাবে, এমনটি বলা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার একটি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, কোথায় ভূগর্ভস্থ পানি কতটা পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই পানির মান কেমন—তা পরীক্ষা করে এলাকাভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে। এরপর ওয়াসা ও সরকারের তদারকিতে নলকূপ বসানোর ব্যবস্থা করা উচিত।
স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা
পানিতে ধাতুর মাত্রা নির্ধারিত সীমার বেশি হলে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই পানি পান করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে জানান সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি থাকলে দীর্ঘদিন সেই পানি পান করার কারণে ত্বকে কালো দাগ ও চামড়া মোটা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ত্বক, ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে বলে জানান সিভিল সার্জন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের দূষণের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, নলকূপের পানিতে কী উপাদান কত মাত্রায় রয়েছে, তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিকর উপাদান নির্ধারিত মাত্রার বেশি পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী পানি শোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।