চট্টগ্রাম ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ট্রাইহ্যালোমিথেন বা টিএইচএম নামক এক ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। কর্ণফুলী পানি সরবরাহ এলাকার ১০টি ভিন্ন ভিন্ন অংশ থেকে মোট ১২০টি নমুনার ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় চার ধরনের টিএইচএম পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গরমের সময়ে কিছু নমুনায় এই রাসায়নিকের মাত্রা অনেক বেশি ছিল বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে একই মাত্রার টিএইচএমযুক্ত পানি পান করলে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা বৃদ্ধি পেতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত হিসাব করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের করা হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৪২৬ জনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪২৬ জন নিশ্চিতভাবেই ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন। কোনো নির্দিষ্ট ক্যানসার রোগীর ওপর এই গবেষণা চালানো হয়নি; বরং পানিতে পাওয়া টিএইচএমের মাত্রা ধরে দীর্ঘদিন সেই পানি পান করলে সম্ভাব্য ঝুঁকির পরিমাণ বের করা হয়েছে।

গবেষণাটি চলতি বছরের জুন মাসে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত সাময়িকী 'জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং'-এ প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণা দলের সাথে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) অধ্যাপক মোছা. ফারজানা রহমান, গবেষক ফারজানা খান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. দেলোয়ার হোসেন।

গবেষকদের মতে, পানি থেকে ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ক্লোরিন অপরিহার্য। তাই টিএইচএম পাওয়া গেছে বলে পানি শোধনে ক্লোরিন ব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা যাবে না। বরং পানি শোধনের প্রক্রিয়ায় জৈব পদার্থের পরিমাণ কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লোরিন ব্যবহার এবং নিয়মিতভাবে টিএইচএম পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

গবেষকদের দাবি, চট্টগ্রামের সরাসরি পাইপলাইনের পানি পরীক্ষা করে টিএইচএমের উপস্থিতি এবং এর সাথে সম্পর্কিত ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম মাঠভিত্তিক গবেষণা।

টিএইচএম মূলত কীভাবে তৈরি হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। টিএইচএম হলো এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ, যা পানি জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহৃত ক্লোরিন যখন পানিতে থাকা প্রাকৃতিক জৈব পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, তখন তৈরি হয়। এটি সরাসরি পানিতে মেশানো হয় না, বরং পানি শোধনের একটি উপজাত হিসেবে তৈরি হয়। নদীর পানিতে থাকা পচা পাতা, শেওলা এবং অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে উৎপন্ন প্রাকৃতিক জৈব পদার্থের সঙ্গে ক্লোরিনের বিক্রিয়ায় এই টিএইচএম তৈরি হতে পারে।

গবেষণায় চার ধরনের টিএইচএম—ক্লোরোফর্ম, ব্রোমোডাইক্লোরোমিথেন, ডাইব্রোমোক্লোরোমিথেন ও ব্রোমোফর্ম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ক্লোরোফর্ম, যা মোট টিএইচএমের প্রায় ৬০ শতাংশ। এলাকাভেদে ক্লোরোফর্মের মাত্রা প্রতি লিটারে ৩১ দশমিক ৫ থেকে ৫২ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত ছিল।

গরমের সময়ে কিছু নমুনায় চার ধরনের টিএইচএম মিলিয়ে প্রতি লিটারে ৭০ মাইক্রোগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে, যদিও শীতকালে এই মাত্রা তুলনামূলক কম ছিল। গবেষকদের মতে, পানির তাপমাত্রা, জৈব পদার্থ, হ্যালাইড এবং ক্লোরিনের পরিমাণের ওপর টিএইচএম তৈরির প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে।

গবেষক অধ্যাপক মোছা. ফারজানা রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে ক্লোরিন প্রয়োজন। তাই টিএইচএম পাওয়া গেছে বলে পানি শোধনে ক্লোরিন ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না; বরং শোধনের সময় পানিতে জৈব পদার্থ কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লোরিন ব্যবহার এবং নিয়মিত টিএইচএম পরীক্ষা করা দরকার।”

মানুষ কেবল পানি পানের মাধ্যমেই টিএইচএমের সংস্পর্শে আসে না। গোসল, রান্না বা পানি ব্যবহারের সময় এটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া ত্বকের মাধ্যমেও এটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষকেরা পানি পান, শ্বাসপ্রশ্বাস ও ত্বক—এই তিন উপায়ে টিএইচএমের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি হিসাব করেছেন। এর মধ্যে পানি পানের মাধ্যমে ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, যেখান থেকেই প্রতি ১০ লাখে আনুমানিক ৪২৬ জনের অতিরিক্ত ঝুঁকির হিসাবটি এসেছে।

বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে ফারজানা রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এই সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। এর অর্থ এই নয় যে এই পানি পান করলে কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হবেনই। পানিতে পাওয়া টিএইচএমের মাত্রা দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে কী পরিমাণ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেই হিসাব করা হয়েছে।” তাঁর মতে, বাংলাদেশেও মোট টিএইচএমের একটি মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন এবং শোধনাগার থেকে গ্রাহকের বাসা পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মিত এই রাসায়নিক পরীক্ষা করা উচিত।

এদিকে, গবেষণা প্রবন্ধের তথ্যের ভিত্তিতে ওয়াসার কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে সংস্থাটি জানায়, গবেষণাটি নির্দিষ্ট ১০টি এলাকা ও নির্দিষ্ট সময়ের নমুনার ওপর করা হয়েছে। নমুনা সংগ্রহের স্থান ও পদ্ধতি নিয়েও তাদের মনে প্রশ্ন রয়েছে।

ওয়াসার দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মোট টিএইচএমের জন্য কোনো একক সীমা নির্ধারণ করেনি, বরং চার ধরনের টিএইচএমের জন্য আলাদা নির্দেশক মান রয়েছে। গবেষণায় পাওয়া প্রতিটি টিএইচএমের গড় মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট মানের নিচে রয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

তবে গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ওয়াসা স্বীকার করেছে যে, তারা নিজে টিএইচএম বা ক্লোরোফর্ম পরীক্ষা করে না। লিখিত বক্তব্যে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ যন্ত্র তাদের পরীক্ষাগারে নেই। ওয়াসার দাবি, গ্রাহক পর্যায় থেকে প্রতি মাসে ২৪০টি নমুনা নিয়ে অবশিষ্ট ক্লোরিন ও কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করা হয় এবং শোধনাগারেও বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করা হয়। তবে গবেষকেরা যে টিএইচএম নিয়মিত পরীক্ষার কথা বলছেন, সেই পরীক্ষা এখনো হচ্ছে না। ওয়াসা জানিয়েছে, পানি উৎপাদন নিয়ে সমীক্ষা করতে একটি কোরীয় পরামর্শক দল চট্টগ্রামে আসবে এবং তাদের টিএইচএমের বিষয়টিও পর্যালোচনা করতে বলা হবে।

গবেষণার তথ্য ও ওয়াসার বক্তব্য নিয়ে কথা বলা হলে চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আসিফুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “টিএইচএম পরীক্ষার ব্যবস্থা ওয়াসাকে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নেই। শুধু শোধনাগারে পানির মান ঠিক রাখলেই হবে না, গ্রাহকের বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত পানি নিরাপদ আছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।”