এটি একটি প্রমাণিত সত্য যে, সাধারণ নাগরিকদের জন্য কেবল নিরাপদ খাবার পানি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে চিকিৎসার পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, সেই বোঝা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। আর সেই নিরাপদ পানি সরবরাহের যে সংস্থার ওপর দায়িত্ব অর্পিত, তাদের প্রধান কাজই হওয়া উচিত পানির গুণগত মান নিশ্চিত করা। তবে সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের 'জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং' সাময়িকীতে চট্টগ্রাম ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণার তথ্য ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কারণ, উক্ত গবেষণায় ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

চুয়েট এবং বুয়েটের একটি যৌথ গবেষক দল চট্টগ্রাম ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির ১২০টি নমুনা পরীক্ষা করে চার ধরনের ট্রাইহ্যালোমিথেন (টিএইচএম) শনাক্ত করেছেন। সাধারণত পানি জীবাণুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ক্লোরিনের সাথে পানিতে বিদ্যমান প্রাকৃতিক জৈব পদার্থের বিক্রিয়ার ফলে এই টিএইচএম তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে টিএইচএমযুক্ত পানি পান করলে শরীরে ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গবেষকদের করা হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৪২৬ জনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই পরিসংখ্যান দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এর অর্থ এই নয় যে, ১০ লাখ মানুষের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই ৪২৬ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন। বরং এটি হলো পানিতে বিদ্যমান টিএইচএমের মাত্রা দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণ করলে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি বৈজ্ঞানিক গাণিতিক হিসাব। তা সত্ত্বেও, এই বিষয়টিকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, চট্টগ্রামের নগরবাসী প্রতিদিন এই পানি পান করছেন এবং দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করছেন।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নিজে টিএইচএম বা ক্লোরোফর্ম পরীক্ষা করে না। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ধরনের পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ যন্ত্র তাদের কাছে নেই। এর অর্থ দাঁড়ায়, লাখ লাখ মানুষ যে পানি ব্যবহার করছেন, তাতে এই ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি আছে কি না, তা জানার কোনো নিয়মিত ব্যবস্থাই ওয়াসার নেই।

পানি শোধনের প্রক্রিয়ায় ক্লোরিন ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার সুযোগ নেই, কারণ ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে ক্লোরিন অপরিহার্য। তবে ক্লোরিন ব্যবহারের ফলে যাতে অতিরিক্ত টিএইচএম তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে শোধন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পানির জৈব পদার্থের পরিমাণ কমানো, প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ক্লোরিন ব্যবহার এবং নিয়মিতভাবে টিএইচএম পরীক্ষা করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমরা মনে করি, ওয়াসার নিজস্ব পরীক্ষাগারে যদি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব থাকে, তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা সংগ্রহ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব ব্যবস্থা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বীকৃত কোনো পরীক্ষাগারের মাধ্যমে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করানো যেতে পারে। পাশাপাশি পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে টিএইচএমের গড় মাত্রার একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নিরাপদ পানি সরবরাহ করা চট্টগ্রাম ওয়াসার মৌলিক দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় যন্ত্র নেই বলে পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদানের পরীক্ষা হবে না—এমন যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে এখন আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।