চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় প্রায় ৪ লাখ মানুষ মারাত্মক আর্সেনিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। ২০২১ সালে পরিচালিত সর্বশেষ আর্সেনিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এলাকার প্রায় ৩৮ শতাংশ নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। সে সময় সতর্ক করার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপগুলোর গায়ে লাল রঙের দাগ দেওয়া হয়েছিল এবং নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে এই পানি পান করা যাবে না। তবে সময়ের আবর্তনে সেই লাল চিহ্নগুলো এখন মুছে গেছে, অথচ পানির ভেতরে আর্সেনিকের বিষাক্ত ঝুঁকি রয়ে গেছে আগের মতোই।
বিকল্প নিরাপদ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় শত শত পরিবার বাধ্য হয়ে সেই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপের পানিই ব্যবহার করে চলেছেন। ফলে মতলব উত্তর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো আর্সেনিকের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে একটি আর্সেনিক প্রজেক্টের আওতায় আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ করে টিউবওয়েলের আর্সেনিক পরীক্ষা চালানো হয়। ওই জরিপে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার ৯৬০টি মালিকানাধীন অগভীর নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১২ হাজার ১৪১টি নলকূপে (প্রায় ৩৮ শতাংশ) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায়। পরীক্ষার পর এই অনিরাপদ নলকূপগুলোতে লাল রঙ স্প্রে করে সতর্ক করা হয় এবং আর্সেনিকমুক্ত বাকি ১৯ হাজার ৮১৯টি নলকূপকে সবুজ রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ায় অধিকাংশ নলকূপের গায়ের সেই লাল চিহ্নগুলো এখন পুরোপুরি মুছে গেছে। নতুন করে চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এবং গভীর নলকূপের অভাব থাকায় স্থানীয়রা পুনরায় ওই লাল চিহ্নিত নলকূপের পানি পান ও রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করছেন।
জানা গেছে, আর্সেনিকের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরকারিভাবে সুপেয় পানির জন্য নির্দিষ্ট গভীরতায় (৬০০ থেকে ১,০০০ ফুট) গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭২০০টি সরকারি গভীর নলকূপ সফলভাবে স্থাপন করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
উপজেলার ইসলামাবাদ এলাকার বাসিন্দা আজিজ আহমেদ বলেন, “কোন নলকূপে এক সময় লাল দাগ দেওয়া হয়েছিল, তা এখন আর চেনার উপায় নেই। নতুন প্রজন্মের অনেকে জানেই না কোনটির পানি ঝুঁকিপূর্ণ, ফলে তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে অজান্তেই তাদের শরীরে ঢুকছে বিষাক্ত আর্সেনিক।”
মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোবারক হোসেন বলেন, “আর্সেনিক হলো একটি স্লোপয়েজন। আর্সেনিক আগের দিনে রাজা বাদশাদের মেরে ফেলার কাজে লাগাতো। আর্সেনিকে যে আক্রান্ত হবে, তার জীবন শেষ হয়ে যাবে চিকিৎসা করাতে করাতে। এটি শরীরে গেলে ব্রেইন, হার্ট, কিডনিসহ শরীরের সকল অঙ্গে ক্যান্সার হতে পারে। আর্সেনিকের প্রাথমিক লক্ষণ চর্মরোগ সৃষ্টি হয়। তাই সবাইকে বিশুদ্ধ পানি পান করার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।”
উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী সজিব চন্দ্র দাস বলেন, “এলাভায় নিরাপদ খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি গভীর নলকূপের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। চাহিদার তুলনায় আমরা খুব সল্প বরাদ্দ পাই। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বৃষ্টির পানি ধারণ এবং প্রক্রিয়াজাত পৃষ্ঠীয় পানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।”
এই বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, “জনস্বাস্থ্যের কাছ থেকে ডাটা নিয়ে আমরা আবারও মার্কিং এর ব্যবস্থাটা করব। নতুন নলকূপ বরাদ্দর পাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।”